http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=36076

ইতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ববাদ আর কৃত্তিম মাংস

সফিক 

 

ইংরেজীতে “Historical Chauvinism” বলে একটা কথা আছে। এর বাংলা কোন প্রতিশব্দ আছে বলে জানা নেই, কাছাকাছি অর্থ করতে গেলে একে বলা যায় ‘ইতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ এর মতো কিছু। ইতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ববাদ কে সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা যায় বর্তমানে বসে অতীতের প্রতি নাক সিটকানো। আরেকটু বিশদভাবে বলতে বললে Historical Chauvinism অর্থ বর্তমান সময়ে বসে, অতীত ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে, বর্তমানের শিক্ষাদীক্ষা, বিজ্ঞান, মূল্যবোধ এসব কিছুর উত্তরাধিকারী হয়ে, বর্তমানের চোখ দিয়ে দেখে, অতীতের মানুষদের নৈতিকতা, যুক্তিবোধ, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদিকে হীন করে দেখা। আরেকটু অন্যভাবে বলতে গেলে এর অর্থ অতীতের মানুষেরা, ‘ইশশ, ওরা কেমন করে এসব করতো’, এই ভেবে আত্মপ্রসাদ নেয়া।

এই রকম ইতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ববাদ আমরা সবাই কমবেশি লালন করি। এটি সবচেয়ে বেশী দেখা যায় যখন আমরা অতীতের বিভিন্ন রকমের সামাজিক, রাজনৈতিক প্রথার আলোচনায় বসি। বিশেষ করে হাজার বছর ধরে ক্রীতদাসপ্রথা, নারীদের প্রতি আচরন, সম্রাট-রাজাদের অমিতাচার, এই সব বিষয়গুলি হলো ইতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র। যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্রীতদাসদের প্রতি চূড়ান্ত অমানবিক আচরন এর কথা পড়ে আমাদের মধ্যে কে বা কারা ক্রীতদাসমালিক এবং সুবিধাভোগীদের প্রতি তীব্র ঘৃনাবোধ করি নি? আমাদের মধ্যে কে মনে করি নি যে মালিক এবং সুবিধাভোগীসমাজের মধ্যে নৈতিকতা-মানবিকতার তীব্র অভাব ছিলো? এখনকার দিনে আমাদের মধ্যে কারা আমাদের পূর্বপুরুষদের নারীদের প্রতি আচরন এর কথা জেনে তাদেরকে একটু হলেও হীনচোখে দেখি না? রবীন্দ্রনাথের মতো শ্রেষ্ঠ রুচি ও প্রতিভার মানুষও যখন দশ-এগারো বছরের মেয়েশিশুকে বিয়ে করে তার সাথে উপগত হন, তখন, রবীন্দ্রনাথের কণামাত্র প্রতিভা না থেকেও কেবল একশ বছর পরে জন্মের সৌভাগ্যের কারনে তার প্রতি একটু হলেও নাক সিটকাতে আমাদের কারো বাধে না। শুধু সামাজিক প্রথা আর ব্যাক্তি আচরনই নয়, অতীতের ইতিহাসে রাজা-রাজড়াদের স্বেচ্ছাচারিতা, সাম্রাজ্যবাদ, শোষন এই সবই কেমন করে অতীতের মানুষেরা মেনে নিতো এসব আমাদেরকে অনেক সময়েই আশ্চর্য করে। আমাদের সবার মধ্যেই এই ধারনাটি কমবেশী গেড়ে বসে যে বর্তমানের আমাদের তুলনায়, অতীতের মানুষজন ন্যায়নীতিবোধ, মূল্যবোধের দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে।

বর্তমানের লেন্সে অতীতকে দেখা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কারন সবকিছুর উপরে আমরা সময়ের সন্তান। আমাদের বর্তমানের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংষ্কৃতি, সমাজ সবকিছুই কয়েক হাজার বছরের এক্যুমুলেটেড সাংষ্কৃতিক বিবর্তনের ফল। বিবর্তন ও পুন্জীভবন (accumulation) মানুষের লিপিবদ্ধ সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়। ঠিক এই জন্যেই কোন একটি সময়ে বসে অতীতের যেকোন সময়কে, সেই সময়ের দৃষ্টিতে দেখার কোনো উপায় নেই। আমরা শত চেষ্টা করলেও আমাদের এই সময়ের জ্ঞান, সংষ্কৃতি, মূল্যবোধকে ভুলতে পারবো না। ইতিহাস বিশ্লেষনের সময়ে ইতিহাসবিদদের এই বর্তমানের লেন্স বিষয়টি সম্পর্কে বিশেষ খেয়াল রাখতে হয়। ইতিহাসবিদ্যায় এই জিনিষটির একটি বিশেষ নামও রয়েছে, Presentism, যার কাছাকাছি বাংলা বলা যায় বর্তমানবাদ। ইতিহাসবিদরা বর্তমানবাদ বলতে বোঝান মূলত দুটি বিষয়কে, (১) অতীতকে বর্তমানের সাপেক্ষে বিশ্লেষন আর (২) নিকট অতীত (খুব কাছাকাছি সময়ের ইতিহাস ৫০-১০০ বছরের মধ্যে) সময়ের অনেক বেশী রেকর্ড থাকার কারনে বর্তমান ও নিকট অতীতকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন বিবেচনা করা। ইতিহাসবিদদের নিজেদের মধ্যেই অনেক বিতর্ক রয়েছে যে অতীত বিশ্লেষনে বর্তমানের দৃষ্টিভংগী কতটুকু এড়িয়ে থাকা সম্ভব তা নিয়ে। অনেকেই বলেন ইতিহাসচর্চার মূল দায়িত্ব সকল রকমের নৈতিক বিচার (moral judgement) এড়িয়ে কেবল নিস্পৃহ ঘটনা ও তথ্য বিশ্লেষন। আবার কেউ বলেন মানুষের সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে হলে নীতি ও মূল্যবোধের বিবর্তন বোঝার চেষ্টা না করে উপায় নেই, সেটা যতই বর্তমানবাদ এর দোষে দুষ্ট হোক না কেনো।

নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের ইতিহাসের মধ্যে বিবর্তন, সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। স্বাভাবিক কারনেই এই বিষয়ে বিজ্ঞানের মতো কোনো যুক্তিগতভাবে সুসংহত ও পরিপূর্ন থিয়োরী দেয়া সম্ভব নয়। এর মূল কারন হলো মানবসমাজকে প্রকৃতির মতো রিডাকশনিস্ট ( Reductionist) দৃষ্টিতে বিশ্লেষন করা প্রায় অসম্ভব। তবু সমাজবিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেন ইতিহাসের মধ্যে সমাজ ও নীতিবোধের বিবর্তনকে কোন তত্বীয় কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখা করার। সামাজিক বিবর্তন ও প্রাকৃতিক বিবর্তনের মধ্যে অনেক রকম মিল থাকায়, অধিকাংশ তত্বই প্রাকৃতিক বিবর্তনকে অবলম্বন করে দাড় করানো হয়েছে।

মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের যেমন বায়োলজিক্যাল ভিত্তি রয়েছে তেমনি নৈতিক সংগঠনে সমাজের ভূমিকাও রয়েছে অনেক। কিছু মৌলিক নীতিবোধ, যেমন পরিবারের প্রতি কর্তব্য, ন্যায় বিচার বোধ, পরোপকার, এই সবের পিছনে বায়োলজিক্যাল ভিত্তির ভূমিকা অনেক বেশী। আবার কিছু কিছু নীতিবোধ, যেমন অন্য জাতির প্রতি বিদ্বেষ-হিংসা, অন্যের অধিকারসচেতনতা, এসবের পিছনে বায়োলজীর সাথে সাথে সমাজ ব্যবস্থার ভূমিকাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর যেহেতু সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে সমাজব্যবস্থা পাল্টে যায়, সেহেতু মানুষের নীতিবোধের বেশকিছু অংশে পরিবর্তন ঘটতে থাকে সময়ের সাথে সাথে। প্রাকৃতিক বিবর্তনের চালিকাশক্তি হলো পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে জীবপ্রজাতির আভ্যন্তরীন পরিবর্তন (mutation) এর পারষ্পরিক মিথষ্ক্রীয়া। সামাজিক বিবর্তনের মূল চালক হিসেবে ধরা হয় সমাজের টেকনোলজী বা উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে বাহ্যিক পরিবেশের মিথস্ক্রীয়াকে।

এখানে টেকনোলজী বলতে আমি কেবল যন্ত্রপাতি বোঝাচ্ছি না, সমাজের টেকনোলজী মানে যন্ত্রপাতি, সিস্টেম, প্রথা, সম্পর্ক, জ্ঞান যা কিছু উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে জড়িত, তাকেই বুঝিয়েছি। টেকনোলজী এবং সে সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান আবার একটি পুন্জীভবন প্রক্রিয়া (Cumulative process)। অতীতের যাবতীয় আরদ্ধ জ্ঞানের কোন কোন অংশ সময়ের সাথে পাল্টে যায় নতুন জ্ঞানের আলোকে, বাকী অংশের অনেকটা থাকে অপরিবর্তিত আবার কিছু কিছু অংশ বিভিন্ন কারনে হারিয়েও যায়। টেকনোলজীর যখন বড়ো পরিবর্তন হয় তখন উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্যে সমাজও বিবর্তিত হয়। আর সমাজ বিবর্তনের সাথে মানুষের বিভিন্ন রকম মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে। সুতরাং উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে মূল্যবোধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন সম্পর্ক রয়েছে।

একথা অবশ্যই বলা দরকার যে উৎপাদন ব্যবস্থাই সমাজ ও মূল্যবোধের একমাত্র নিয়ামক নয়, এটি ছাড়াও আরও অনেক ফ্যাক্টর আছে। সামাজিক বিবর্তন একটি পথ নির্ভর (path dependent) প্রক্রিয়া। কোন একটি সমাজ তার ইতিহাসে কি ধরনের পরিবেশে ছিলো, তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসই বা কি ছিলো এ সবই সেই সমাজের বর্তমান মূল্যবোধ ব্যবস্থার পেছনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। যেহেতু দুটি ভিন্ন সমাজের পথ পুরোপুরি এক হয় না সেহেতু দেখা যায় যে অনেকক্ষেত্রে দুটি ভিন্ব সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা কাছাকাছি হলেও সেখানে সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। চীন ও ভারতের অর্থনীতি যদি খুব কাছাকাছি রকমেরও হতো তবু চীন ও ভারতের সমাজের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য অবশ্যই থাকতো। কারন গত ৭০ বছরের মধ্যেই চীন ও ভারত সম্পূর্ন ভিন্ন দুটি রাজনৈতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। তবে আধুনিক বিশ্বসমাজের বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ন দিক হলো যে দ্রুততর টেকনোলজী পরিবর্তন, দ্রুততর সামাজিক পরিবর্তন এবং দ্রুততর সংষ্কৃতির ছড়িয়ে পরা (Transmission)। এজন্যে বিভিন্ন দেশের মানুষের মূল্যবোধের convergence হচ্ছে দ্রুততর।

উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সাথে সমাজ এবং সেই সাথে মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন কিভাবে হয় এটা বোঝার জন্যে ক্রীতদাস প্রথা এবং এর প্রতি মানুষের মনোভাব এর চেয়ে ভালো উদাহরন কমই হয়। পনেরো হাজার বছর আগে, যখন পৃথিবীতে মানুষের সবগুলি সমাজই ছিলো ছোট ছোট শিকারী-সংগ্রাহক (Hunter-Gatherer) এর দল তখন ক্রীতদাস বলে কিছু ছিলো না। কারন সেই জীবনে নিজের দলের বেচে থাকার জন্যে খাবার জোগাড় করাই এতো কষ্টকর ছিলো যে বাড়তি ক্রীতদাস পেলে তাকে খাওয়ানোর মতো সামর্থ্য কোনো দলের হতো না। সেকারনে এক দলের সাথে আরেক দল লড়াই হতো মূলত শিকারের জায়গার দখল নিয়ে। জয়ী দল পরাজিতদের দেশ ছাড়া করতো কিংবা সবগুলো পুরুষ আর শিশু মেরে ফেলে কেবল সন্তানজননক্ষম নারীদের নিজ দলে নিয়ে নিতো। ঠিক একই কারনে মানুষ কৃষিকাজ শুরু করার সময়েও দাসপ্রথার প্রচলন হয় নি। দাসের জন্য উদ্বৃত্ত খাবার ছাড়া আরো দরকার হয় দাসের শ্রমের প্রান্তিক মূল্য (Marginal Productivity) যথেষ্ট পরিমানে হওয়া। একজন দাস সারাদিন খেটে যদি কেবল নিজের খাদ্যের কাছাকাছি উৎপাদন করতে সক্ষম হয় তবে মালিকের শোষন করার মতো কোনো উদ্বৃত্ত থাকে না।

ধাতুর আবিষ্কার, কৃষিকাজে পশুশ্রম এবং এরকম আরো কিছু উদ্ভাবনের ফলে কৃষিকাজের শ্রমের Marginal Productivityঅনেক বেড়ে গেলো এবং তখনই সমাজে দাস রেখে সবচেয়ে কষ্টকর কাজগুলো তাদের দিয়ে করিয়ে নেয়া সম্ভব হলো। দাসপ্রথার শুরু হলো নগর সভ্যতার পত্তন ও বিকাশের অন্যতম ফ্যাক্টর। দাসদের শ্রমেই প্রাচীন মিসর, ব্যাবিলনের নগর-পিরামিড, চীনের প্রাচীর, গ্রীসের পার্থেনন গড়ে ওঠে। প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে (খ্রী ৪০০-৫০০ পর্যন্ত) দাসপ্রথ নিয়ে একটি জিনিষ উল্লেখ্য যে যেইসব রাজ্যগুলি বেশী পরাক্রমশালী ও সমৃদ্ধ ছিলো, সেখানেই দাসের ব্যবহার বেশী ছিলো এবং দাসদের প্রতি মালিকশ্রেনীর মূল্যবোধ ততটাই উন্নাসিক ছিলো। প্রাচীন গ্রীসে সবচেয়ে বিস্তারিত রাজ্য ছিলো এথেন্সের আর এথেন্সেই দাসদের অবস্হা ছিলো সবচেয়ে খারাপ। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্রীতদাসের সহজলভ্যতাই এই ধরনের এটিচিউডের মূল কারন। এসময়ে অ্যারিস্টটলের মতো শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ দাসপ্রথাকে মানবসমাজের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নীতি বলেই গণ্য করতেন। দাসদের প্রতি ব্যবহার নিম্নতম পর্যায়ে নামে রোম সাম্রাজ্যের মধ্যগগনে (খ্রী পূ ১০০ থেকে খ্রী ২০০) এই সময়ে রোম সাম্রাজ্য তার সকল প্রতিবেশীর চেয়ে এতো শক্তিশালী হয় এবং আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধরে আনা লক্ষ লক্ষ দাস এতো সহজপ্রাপ্য হয় যে সবচেয়ে সবল শক্তিশালী ক্রীতদাসদের নিয়ে গ্ল্যাডিয়েটর খেলা নিয়মিত আনন্দ বিলাসে পরিনত হয়।

এখানে ইতিহাসে সাংষ্কৃতিক বিবর্তনের আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। খ্রী:পূ ৫০০ থেকে খ্রী ৫০০ এই সময়টিকে বলা যায় বিশ্বসভ্যতার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মপ্রথার যুগ। এসময়েই সভ্যতার বৃহৎ ধর্মগুলি ফর্মালাইজড হয়ে উঠে। বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাব ও বিবর্তন মানুষের সভ্যতার পুন্জীভবন (accumulation) প্রক্রিয়ার স্পষ্ট উদাহরন। প্রতিটি ধর্মই এর আগের ধর্ম ও প্রথার উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠে এবং কিছু নতুন স্পষ্ট মতবাদ দিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করে। এই সময়ে প্রাচ্য ও পশ্চিমে আসা ধর্মগুলি সাধারনত বড়ো বড়ো সাম্রাজ্যের প্রান্তসীমায়, যেখানে দাসদের সংখ্যা কম এবং যেখানে সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তির প্রকোপ কম, সেরকম এলাকাতেই প্রথমে বিকাশ হয়। নতুন ধর্মগুলি সবচেয়ে আবেদন রাখে গরীব, ভূমিদাস, ক্রীতদাসদের মধ্যে যাদের এই পৃথিবীতে প্রাপ্তির আশা কম। একারনে নতুন ধর্মগুলি সাধারনত দরিদ্র ও ক্রীতদাসের অধিকার নিয়ে কিছু ভালো নির্দেশনা দেয় যেনো এই শ্রেনীর লোকেরা এতে আকৃষ্ট হয়। এর পরেও ধর্মগুলি সাধারনত পুরো সমাজ অর্থনীতিকে পাল্টে দেবার মতো বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন, যেমন দাসপ্রথার পুরো বিলুপ্তি, এসবের কথা বলে না কারন এতে সমাজের মালিকশ্রেনী ছাড়াও রাজরোষ ধর্মের পানে ধেয়ে আসবে দ্রুত ও ব্যাপক ভাবে।

পন্চম শতকের পর থেকে পশ্চিমে রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপ রাজনৈতিকভাবে খন্ডবিখন্ড হয়ে পড়ে কিন্তু মধ্য ও নিকট প্রাচ্যে অনেক বড় বড় সাম্রজ্য, যেমন বাইজেন্টাইন, আরব, গড়ে ওঠে। এইসব সাম্রাজ্য দাসপ্রথাও রমরমিয়ে চলে। তবে নতুন ধর্মগুলির প্রভাবে এসময়ে দাসদের সাথে ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক সহনীয় হয়। বিশেষ করে মালিক ক্রীতদাস যখন একই ধর্মের অনুসারী হয় তখন ক্রীতদাসকে কেবলমাত্র ব্যাক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে আচড়ন করা কঠিন হয়ে পরে।

এদিকে মধ্যযুগীয় ইউরোপে (খ্রী ৩০০ থেকে ১৪০০) কোন একক সাম্রাজ্য বিস্তার হয় নি। এই সময়ে ধীরে ধীরে পুরো মহাদেশই খ্রীস্টান হয়।অন্ধকার যুগ সভ্যতার বিকাশ বন্ধ হওয়ার ফলে জনসংখ্যাও কমে আসে রোম সাম্রাজ্যের তুলনায়। রাজা- জমিদারের কাছে গরীব প্রজাদের অর্থনৈতিক মূল্য বেড়ে যায়। সেই সাথে দাসের সরবরাহ কমে যাওয়া ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কারনেই ক্রীতদাস প্রথা এইসময়ে ইউরোপে বন্ধ হয়ে যায় যদিও ভুমিদাস প্রথা, যার মাধ্যমে কৃষকেরা একটি নির্দিষ্ট এলাকার ভূস্বামীর অধীনস্ত হয়ে থাকতো বংশের পর বংশ, সেটি পূর্নমাত্রায় বিকশিত হয়।

ষোড়শ শতাব্দীতে উ: ও দ: আমেরিকার নতুন মহাদেশ আবিষ্কারের পরে মানব ইতিহাসে নেমে আসে কলংকতম একটি অধ্যায়। নতুন মহাদেশের অজস্র সোনা, রূপা’র খনিতে, বিশাল বিশাল আখ, তামাক, তুলার খামারে কাজ করার জন্যে প্রয়োজন অজস্র শ্রমিক। কিন্তু আমেরিকার আদিবাসীদের অধিকাংশ ততদিনে গনহত্যায় আর বিভিন্ন বাইরের জীবানুর আক্রমনে নিশ্চিন্হ হয়ে গেছে। এই বিপুল সম্পদ আহরনের উপায় কি? আটলান্টিক এর ওপারেই রয়েছে আফ্রিকা নামের এক বিশাল মহাদেশে যেখানে রয়েছে কোটি কোটি শক্ত সমর্থ মানুষের এক অফুরন্ত ভান্ডার। শুরু হলো আটলান্টিক দাস চক্র (Atlantic Slave Trade). ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগীজ, ডাচ, ডেনিশ ইউরোপের সবদেশের ব্যবসায়ীরা ঝাপিয়ে পড়লো অত্যন্ত লাভজনক একটি অর্থনীতিতে। আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার শ্রমিক কিনে, জাহাজের খোলে যতদূর সম্ভব প্যাক করে ৫০-৬০ দিনের পথ পাড়ি দিয়ে আমেরিকা, ক্যারিবিয়ানের খনিতে খামারে উচ্চমূল্যে বিক্রি। আর তারপর সেইসব খনি আর খামারে বংশের পর বংশ খাদ্যের বিনিময়ে অমানুষিক শ্রম। এর বিনিময়ে ইউরোপে আসতে থাকলো সোনা, ধাতু, আর সস্তায় চিনি, তামাক, কাপড় এর অন্তহীন সরবরাহ।

এটা লক্ষনীয় যে এই আফ্রিকান ক্রীতদাসদের কিন্তু ইউরোপে নিয়ে যাওয়া হতো না। কারন ততদিনে ইউরোপের অর্থনীতিতে কৃষক, শ্রমিক, কারিগর এসব সাধারন মানুষের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। বাইরে থেকে ক্রীতদাস আনা হলে এই সব সাধারন মানুষের পেশার দাম কমে যেতো এবং রাজ-রাজড়ার বিরুদ্ধে অসন্তোষ বি্দ্রোহে পরিনত হতো। যেহেতু হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে দাসশ্রমের সুবাদে সস্তায় নানা রকম খাদ্য ও পণ্য পাওয়া যাচ্ছিলো সেহেতু নতুন করে আবার দাসশ্রমের ব্যাপক ব্যবহার ইউরোপ-আমেরিকার শ্বেতাংগ সাধারনের মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। যাও কিছুটা প্রতিক্রীয়া হতো সেটাকে দমিয়ে রাখার জন্যে চার্চের কিছু নেতা আর কিছু বিখ্যাত পন্ডিত এটা প্রচার করতো যে আফ্রিকানরা ঠিক পুরোপুরি আধুনিক পর্যায়ের মানুষ নয়। তাদের মধ্যে আত্মাই নেই অথবা থাকলেও সেটা পশুদের মতো নিম্ন পর্যায়ের (১) এজন্য জ্বালা-যন্ত্রনা, দু:খ-কষ্ট তাদের অনেক কম অনুভুত হয়। এমনকি আজকের দিনেও এর কাছাকাছি বিশ্বাস আছে এরকম লোকজন সংখ্যায় একেবার নগন্য নয়।

দাসশ্রমের লাভ ইংল্যান্ড ও ইউরোপে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে শিল্পবিপ্লবের জন্ম ও প্রসারে অনেক ভুমিকা রাখে। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের প্রসার আবার সমাজ ও অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। শিল্পবিপ্লব এর সাথে সাথে পুজিবাদী ও মুক্তবাজার অর্থনীতির দাবী ওঠে কারন সেই সময়ে শিল্পস্থাপনের মতো পুজি কেবল মাত্র ব্যবসায়ী শ্রেনীর হাতেই ছিলো, রাজা বা রাষ্ট্রের কাছে নয়। পুজিবাদী ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার বিকাশের জন্য মুক্তবাজার আর অবাধ বাণিজ্যের দাবী তোলে (২). এদিকে আমেরিকার বিভিন্ন রকম দাসভিত্তিক খনি, আখের প্ল্যান্টেশন এসব ছিলো ইউরোপ আমেরিকার অন্যান্য মুক্তশ্রমিক ভিত্তিক খনি, খামারের চাইতে অর্থকরভাবে অনেক অদক্ষ। কারন ক্রীতদাস কখনোই বেতনভিত্তিক মজুরের মতো কাজ করতে আগ্রহী ছিলো না। এইসব ক্রীতদাস ভিত্তিক ব্যবসা ও খামার গুলিকে ইউরোপ আমেরিকার সরকার বিভিন্ন রকম ট্রেড প্রটেকশনের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতো মালিকশ্রেনীকে খুশি রাখতে।

কিন্তু শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে নতুন শিল্পব্যবসায়ী শ্রেনী গড়ে ওঠে যারা সরকারকে চাপ দিতে থাকে দাসপ্রথার উপরের নির্ভরতা কমানোর জন্যে। সাধারন জনগন, যারা বাধ্যহতো দাসশ্রমের ফসল পণ্যগুলি উচ্চমূল্যে কিনতে, তারাও দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করে। শিল্পবিপ্লবের ফলে এমনিতেই ইউরোপ, আমেরিকার আধুনিক রাষ্ট্রগুলির অর্থনীতিতে দাসশ্রমের উপরে নির্ভরতা অনেক কমে আসে। এছাড়া এই সময়ে ফরাসী ও মার্কিন বিপ্লবের পর সাধারন মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার নিয়েও সচেতনতা ছড়িয়ে পরতে থাকে। মানবাধিকার এর ধারনা দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের আলোচনার গন্ডী ছাড়িয়ে সাধারন মানুষের চিন্তাভাবনাতেও প্রসারিত হয়। একারনে উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই দাসপ্রথা রহিতকরন এর আন্দোলন প্রসার পেতে থাকে। বৃটেন ও তার বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যের সর্বত্র দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয় ১৮৩৪ সালে। ফরাসী রাষ্ট্র ও উপনিবেশেও তা নিষিদ্ধ হয় ১৮৪৮ সালে (২)।

আমেরিকার উত্তর পূর্বান্চলের স্টেটগুলি, যেটা নিউ ইংল্যান্ড বলে পরিচিত, সেখানে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়েছিলো ১৮০০ সালের আগেই। কিন্তু ১৮৫০ সালের মধ্যে যখন সভ্যজগতের প্রায় সর্বত্র দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিলো তখনো আমেরিকার দক্ষিনের স্টেটগুলি কেনো দাসপ্রথাকে আরো সজোড়ে, যেকোনো মূল্যে আকড়ে ধরে রাখতে চাইলো? দক্ষিনের স্টেটগুলির শ্বেতাংগ সাধারন জনগন ইতিহাসের অমোঘ যাত্রা চোখের সামনে দেখেও দেখছিলো না?

আমেরিকার বিখ্যাত লেখক-চিন্তাবিদ আপটন সিনক্লেয়ার (Upton Sinclair) এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, “It is difficult to get a man to understand something, when his salary depends on his not understanding it.” কথাটির অর্থ হলো যে যদি কারো জীবিকা নির্ভর করে কোন একটি বিষয় না বোঝার উপরে তবে সেই বিষয়টি তাকে বোঝানো খুবই কষ্টকর হয়।

আমেরিকার দক্ষিনের অর্থনীতি অনেক বেশী নির্ভরশীল ছিলো দাসশ্রমিক ভিত্তিক তামাক আর তুলার প্ল্যানটেশনের উপরে অন্যদিকে উত্তরের রাজ্যগুলি ছিলো শিল্প আর ছোট খামার নির্ভর। ১৮৪০ সালে দুনিয়ার দুই তৃতীয়াংশই তুলাই উৎপাদিত হতো দক্ষিনের প্ল্যান্টেশনগুলিতে। আমেরিকার বিখ্যাত সিভিল ওয়ারের (১৯৬১-৬৫) এর আগে এবং এর পরে আজ অব্দি দক্ষিনের অনেক রাজনীতিবিদ, লেখক বলতেন যে ক্রীতদাস প্রথা জোর করে উঠিয়ে দেবার কোন দরকার ছিলো না। এমনিতেই শিল্পায়ন আর অন্যান্য কারনে দাসশ্রম অলাভজনক হয়ে উঠছিলো। উত্তরের রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদরা বেশী চাপ দেবার কারনেই, আত্মসম্মানের জন্যে দক্ষিন আলাদা হবার ঘোষনা করে যুদ্ধের সূত্রপাত করে।

আমেরিকার নোবেল পুরষ্কার পাওয়া বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ রবার্ট ফোগেল তার একটি খ্যাতনামা গবেষণা বই “Time on the Cross” (৩) এ দেখিয়েছিলেন যে সময়ের সাথে সাথে দক্ষিনের গৃহযুদ্ধপূর্ব দাসঅর্থনীতি অনেক দক্ষ হয়ে উঠেছিলো। তার গবেষনায় বেরিয়ে আসে যে দাসমালিকেরা তাদের ক্রীতদাসদের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদের মতই দেখতো। দাসরা যেনো শারীরিক-মানসিক ভাবে সুস্থ থাকে সেটাও ছিলো দাসমালিকদের বড়ো প্রয়োরিটি। দাসদের সর্বত্তম ব্যবহার করে দক্ষিনের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিও ইউরোপ ও আমেরিকার শিল্পসমৃদ্ধ অর্থনীতিগুলি সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম হতো। একটি হিসাবে দেখা যায় যে যেখানে ১৮৬০ সালে গৃহযুদ্ধের আগে উত্তরের জনসংখ্যা ছিলো ২ কোটির কিছু বেশী ও দক্ষিনের জনসংখ্যা ছিলো ৯০ লাখ (অনুপাত ২.৩ : ১), সেসময়ে উত্তর ও দক্ষিনের সামগ্রিক সম্পদের অনুপাত ছিলো ১.৫ : ১ আর দক্ষিনের সম্পদের প্রায় অর্ধেকটাই ছিলো ক্রীতদাসদের মূল্য। সুতরাং ক্রীতদাস ছাড়া উত্তর ও দক্ষিনের সম্পদের অনুপাত হতো ৩ : ১ (৪)।

আমরা যখন দক্ষিনের অর্থনীতিতে দাসদের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি তখন এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কি কারনে দক্ষিনের শ্বেতাংগ জনগোষ্ঠী ভয়াবহ রক্তপাত করে হলেও দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার জন্যে ছিলো বদ্ধপরিকর। রবার্ট ফোগেল পরিষ্কার মত দেন যে গৃহযুদ্ধ ছাড়া দাসপ্রথা বিলুপ্তি ঘটতে আরো অনেক বছর সময় লেগে যেতো।

আজকে যখন আমরা গৃহযুদ্ধপূর্ব দক্ষিনের দাসপ্রথা নিয়ে চিন্তা করি তখন আমরা আশ্চর্য হই দক্ষিনের লোকজন কি এতোটাই নিষ্ঠুর বিদ্বেষী ছিলো যে তারা এই দাসপ্রথার অমানবিকতা বুঝতে পারতো না? আমরা যে অমানবিকতা দিব্যচোখে দেখতে পারছি দেড়শ বছর পরে বসে, তার কি সেটা চর্মচোখের সামনে দেখেও বুঝতো না? প্রকৃতপক্ষে দক্ষিনের লোকজন দুনিয়ার আর সব এলাকার মানুষের মতই ছিলো, বেশী নিষ্ঠুরও নয়, বেশী অমানবিকও নয়। আসল কথা হলো আপটন সিনক্লেয়ারের সেই বিখ্যাত কথাটি, যখন কারো জীবিকা নির্ভর করে কোন একটি বিষয় না বোঝার উপরে তখন সেই বিষয়টি বুঝতে পারা তার পক্ষে খুবই কঠিন হয়ে পরে। দক্ষিনের লোকেরা ক্রীতদাস প্রথাকে জাস্টিফাই করার জন্যে নিজেদেরকে এবং বাইরের লোকজনকে নানা রকম বুঝ দিতো। কালো আফ্রিকানরা সহজ সরল, মালিকের নিয়ন্ত্রনেই তারা ভালো থাকে, স্বাধীনতা পেলে উচ্ছৃংখল হয়ে পড়বে, আফ্রিকায় স্বাধীন থাকার চেয়ে আমেরিকায় দাস হিসেবে অনেক ভালো আছে এরকম আরো অনেক কিছু। সেই সাথে বাইবেল থেকে নেয়া কিছু জাস্টিফিকেশন তো ছিলোই।

এছাড়াও তারা বিশেষভাবে উত্তরের লোকজনদের কে দেখাতো সেই সময়ে নগরগুলিতে শিল্পশ্রমিকদের করুন জীবন। উত্তরের কারখানাগুলোয় নারী, পুরুষ, শিশুদের ছুটি বিহীন ১২-১৫ ঘন্টা একনাগারে শ্রম, নামমা্ত্র বেতনে নোংরা বস্তিতে অপুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে রোগে ভোগে মৃত্যুবরণ। দক্ষিনের লোকেরা বলতো যে এই সব শ্রমিকদের তুলনায় তাদের প্ল্যান্টেশনের দাসেরা অনেক সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর দীর্ঘ জীবন কাটায়। তাদের এই যুক্তির সারবত্তা অবশ্যই ছিলো অনেক। উত্তরের লোকেরা তাদের মধ্যে শিল্পশ্রমিকদের ভয়াবহ জীবন দেখেও না দেখার ভান করতো কারন উত্তরের অর্থনীতির ভিত্তিই ছিলো নানা ধরনের শিল্প আর খনি। যুদ্ধের পরে শিকাগোর হেমার্কেট এ পয়লা মে’র মতো আরও অনেক শ্রমিক অসন্তোষ এর পরেই শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সচেতনতা আসে।

এতক্ষন ধরে দাসপ্রথা নিয়ে কথা বলার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিলো যে অর্থনীতি ও সাংষ্কৃতিক বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ কিভাবে পাল্টে যায় সেটি দেখানো। এটা আলোচনার দুইভাগের প্রথম ভাগ মাত্র।

বছর দুয়েক আগে আমার নিয়মিত পড়া একটি ব্লগে (The Daily Dish -http://dish.andrewsullivan.com/) ইন্টারেস্টিং পোস্ট পড়েছিলাম। পোস্ট টর বিষয় ছিলো যে, আজকে যেমন আমরা Historical Chauvinism এর প্রভাবে, অতীতের বিভিন্ন সময়ের মানুষদের বিভিন্ন মূল্যবোধকে খুব হীনচোখে দেখি, ঠিক তেমনিই, আজ থেকে ৫০-১০০ বছর পরে আমাদের উত্তরাধিকারীরা, আমাদের আজকের কোন বহুলপ্রচলিত প্রথাকে সবচেয়ে ঘৃনার চোখে দেখবে? বিভিন্ন দিক আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত আসে যে আমাদের উত্তরাধিকারীরা আমাদের পশু হত্যা ও তার মাংস ভোজনকেই সবচেয়ে ঘৃনার চোখে দেখবে।
[অনেক খুজেও পোস্ট টির লিংক খুজে না পাওয়ায় দু:খিত। অনেক দিন ধরেই বেশ কয়েকবার সার্চ করে চেষ্টা করেছি তবু খুজে পাই নি]

আমার এই পোস্টের মূল উদ্দ্যেশ্য নিরামিষ ও মাংস ভোজনের দোষগুন নিয়ে আলোচনা নয়, মূল লক্ষ্য আমরাও কিভাবে Historical Chauvinism এর শিকার হবো সেটা তুলে ধরা। আর তার জন্যে প্রয়োজন মাংস খাওয়া কেনো ভবিষৎ এ অনৈতিক আর নিষ্ঠুর বলে প্রতিভাত হতে পারে সেটা উল্লেখ করা। আমি সংক্ষেপে আর দ্রুত কয়েকটি পয়েন্ট বলে যাচ্ছি।

আমাদের প্রধান খাদ্য যেসব গৃহপালিত পশু, গরু, ছাগল, ভেড়া ও শুকর, এসব প্রাণী আমরা যতটা কল্পনা করতে পারি তার চেয়েও অনেক বেশী বুদ্ধিমান আর সংবেদন শীল। বিখ্যাত প্রাইমেটোলজিস্ট আর নৃতত্ববিদ জেন গুডাল বলেছেন, ” Farm animals feel pleasure and sadness, excitement and resentment, depression, fear, and pain. They are far more aware and intelligent than we ever imagined…they are individuals in their own right — Jane Goodall.” (৫) এসব পশু যে শুধু স্নেহ, ভালোবাসা, ভয়, আতংক অনুভব করে না তাদের মৃত্যুভয়ও আছে। কোরবানী’র দিন সকালে যারা একের পর এক বাসার সামনে বেধে রাখা পশুদের ভয়ে, আতংকে বিস্ফোরিত চোখ দেখেছেন আর কিছুক্ষন পর পর আর্তনাদ শুনেছেন, তারা কেউ হলফ করে বলতে পারবেন না যে পশুদের মধ্যে আমাদের মতই সংবেদনশীলতা আর মৃত্যুভয় নেই। বিজ্ঞানীরা বলেন যে পশুরা ভবিষৎ চিন্তা করতে পারে, স্বপ্ন দেখে, নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে, কিছু কিছু tool ব্যবহার করতে পারে এবং এই শিক্ষাগুলি পরবর্তী প্রজন্মকে যত্ন করে শেখায়ও।

দুনিয়ায় এই মুহুর্তে দেড়শ কোটির বেশী গরু, একশ কোটি ভেড়া-ছাগল আর একশ কোটি শুকর পালন করা হচ্ছে খাদ্যের জন্যে। গত দশ বছরে বিশেষ করে শুকরের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনেক গবেষনা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলেন যে শুকর কুকুরের চেয়েও অনেক বেশী বুদ্ধিমান একটি প্রাণী। শুকরকে বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে এখন ডলফিন, হাতী এদের সমকক্ষ ধরা হয়। একটা বহুল প্রচলিত কথা হলো যে একটি পূর্নবয়ষ্ক শুকর এর বুদ্ধিমত্তা একটি তিন বছরের মানব শিশুর সমতুল্য (৬) রিচার্ড ডকিন্স বলেছেন যে, “At very least, I conclude that we have no general reason to think that non-human animals feel pain less acutely than we do, and we should in any case give them the benefit of the doubt. Practices such as branding cattle, castration without anaesthetic, and bullfighting should be treated as morally equivalent to doing the same thing to human beings”।(৭)

প্রশ্ন উঠতে পারে যে মানুষ তো গৃহপালিত পশুদের নিয়মিত ভাবে ভক্ষন করছে দশহাজার বছরের বেশী সময় ধরে। আমাদের আজকের এই যুগ কি পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতায় বিশেষ বা অনন্য কিছু? হ্যা, আমাদের এই যুগ নিষ্ঠুরতায় সত্যিই একদম অনন্য। দশ হাজার বছর ধরে মানুষ পশু পালন করেছে তাদের খামারে চারনভূমিতে। এখানে পশুরা কিছুটা স্বাধীনভাবে জীবন কাটিয়েছে, নিয়মিত খাবার পেয়েছে, সমজাতীয় দের সাথে খেলাধূলা করে সামাজিকভাবে জীবন কাটিয়েছে। কেবল মৃত্যুর সময়ে সাময়িক এবং তীব্র যন্ত্রনা পেয়েছে। প্রাকৃতিক জীবনের সাথে তুলনা করলে এটা তেমন খারাপ কিছু নয়।

বিংশ শতাব্দীতে যন্ত্রসভ্যতার শিখরে উঠে মানুষ সৃষ্টি করে আরেকটি ভয়াবহ অধ্যায় Factory Farming. বিশাল, বন্ধ ঘরের মধ্যে, হাজার হাজার পশুকে সারাজীবন আটকে রেখে, মাংসের জন্যে প্রতিপালন। কল্পনা করুন যে একটা দুই ফুট বাই দুই ফুট বন্ধ জায়গার আপনাকে জন্ম থেকে নিজের মলমূত্রের মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছে, প্রতিদিন আপনাকে জোর করে বিস্বাদ একটা ল্যাবড়া খাওয়ানো হচ্ছে, নিয়মিত বিভিন্ন ইন্জেকশন দেয়া হচ্ছে আপনাকে মোটাতাজাকরনের জন্যে, দিনরাত আপনার সমগোত্রীয়দের যন্ত্রনার আর্তনাদ শুনতে হচ্ছে, তারপরে কোন একদিন আপনাকে গুতামেরে দলবেধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আপনাকে মেরে ফেলার জন্যে। Factory Farming এর ভয়াবহতা নিয়ে বলে শেষ করা যাবে না। ইউটিউবে কেবল Factory Farming animal cruelty এসব নিয়ে সার্চ করলে অসংখ্য ভিডিও পাবেন যা আপনাকে সবচেয়ে ভয়ংকর Horror Science Fiction মুভির চেয়েও বেশী শিহরিত করবে।

এখন আবার প্রশ্ন উঠতে পারে যে ৭ বিলিয়ন মানুষকে মাংস খাওয়াতে হলে Factory Farming ছাড়া উপায় কি? এমন তো নয় যে আধুনিক মানুষ Factory Farming এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানে না। তবু নিজের প্লেটে মাংস আসবে বলে এই ভয়াবহতা আমাদের মনে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া করছে না। কয়েক লক্ষ বছরের বিবর্তনে মাংস খাওয়ার আকর্ষনের যে জেনেটিক উত্তরাধিকার আমাদের মধ্যে ঢুকে গেছে পাকাপোক্তভাবে, সেটাকে অগ্রাহ্য করা তো এতো সহজ নয়। আগামীর মানুষরাও মাংসের প্রতি আকর্ষন থেকে মুক্ত থাকবে এটা বলা যায় না। সুতরাং ভবিষৎ প্রজন্ম কি কারনে আমাদের ঘৃনা করবে Factory Farming এর জন্যে? এর সোজা উত্তর হলো টেকনোলজীর বিবর্তন।

উইনস্টন চার্চিল ১৯৩২ সালে তার একটি রচনা, “Fifty Years Hence” এ বলেছিলেন যে ভবিষৎ এ মানুষ আর মাংসের জন্যে আস্ত পশু পালন করবে না, “”We shall escape the absurdity of growing a whole chicken in order to eat the breast or wing, by growing these parts separately under a suitable medium.” (৮) অর্থাৎ মানুষ পশুর বিভিন্ন অংগ-প্রতংগ কারখানায় আলাদাভাবে তৈরী করে বড়ো করবে। চার্চিলের এই উক্তিটি গত ৭০ বছর ধরে বিখ্যাতদের হাস্যকর ভবিষৎবাণী দের তালিকায় সবসময়েই উপরের দিকে ছিলো (“I think there is a world market for maybe fivecomputers.” Thomas Watson, president of IBM, 1943, “Television won’t be able to hold on to any market it captures after the first six months. People will soon get tired of staring at a plywood box every night.” Darryl Zanuck, executive at 20th Century Fox, 1946)। কিন্তু গত দশবছরের মধ্যে এই চিত্রটি হঠাৎ পুরো পাল্টে যায়। এখন আর কেউ চার্চিলের এই উক্তিটি হাসির জন্যে উথ্থাপন করে না বরং কিছুটা আশ্চর্য মিশ্রিত শ্রদ্ধার সাথেই স্মরন করে। এর কারন হলো কৃত্তিম মাংস (Artificial Meat).

এখন, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে, বিশ্বের গবেষণাগারগুলিতে যেকোন পশু অথবা প্রাণীর মাংসখন্ড কৃত্তিম ভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব। গত দশ বছরে ল্যাবরেটরীতে কৃত্তিম মাংস তৈরীর প্রক্রিয়াটি অনেক এগিয়েছে। স্টেম সেল (stem cells) গবেষনার বিভিন্ন ব্রেক থ্রু’ই এই সম্ভাবনার নতুন দিগন্তকে উন্মোচিত করেছে। সবচেয়ে বহুল প্রচলিত পদ্ধতিটি সংক্ষেপে এরকম। জীবন্ত বা সদ্যমৃত পশুর শরীর থেকে পেশী ও অন্যান্য মাংসকোষের স্টেম সেল এর স্লাইস কেটে নেয়া হয় এবং এগুলোকে পুষ্টির জন্যে গ্রোথ মিডিয়ামে ডুবিয়ে রাখা হয় সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে। এখানে স্টেম সেলগুলো প্রকৃত পেশী ও অন্যান্য কোষে পরিনত হয়। এর পরে যেন কোষগুলি যেনো দ্রুত বৃদ্ধি পায় সেকারনে এদেরকে এমন একটি যন্ত্রব্যবস্থার মধ্যে রাখা হয় যে কোষগুলি যেনো নিয়মিত নড়াচড়া করানো হয়। এর কারন মাংসপেশী যদি কোন রকম নড়াচড়া ছাড়া ফেলেরাখা হয় তবে সেটির বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে Muscle atrophy হয়। এর সাথে আলাদাভাবে জন্মানো চর্বি ও অন্যান্য কোষ যোগ করা হয় স্বাদ বৃদ্ধির জন্যে। পূর্ন বৃদ্ধি হলে মাংসখন্ডটি বের করে প্যাকেট করে ফেলা হয়। প্রথমে যে পশু থেকে যে stem cell নেয়া হয়েছে সেটি বার বার ব্যবহার করা যায়। সুতরাং একটি পশু থেকেই মানুষকে শত শত বছর খাওয়ানো সম্ভব, নতুন করে হত্যার কোন দরকার পরে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে থ্রী ডাইমেনশনাল প্রিন্টিং পদ্ধতিতে টিস্যু থেকে কৃত্তিম মাংস উৎপাদন করে সেটিকে আসল পশুর মাংসখন্ডের মতই স্বাদ ও টেক্সচার দেয়া সম্ভব হবে।

কৃত্তিম মাংস এখনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণাগারগুলিতে তৈরী করা হচ্ছে কিন্তু এখনো তা সফলভাবে বানিজ্যিকভাবে উৎপাদনের সম্ভাবনা কম। এখন সামান্য কয়েক আউন্স মাংস তৈরী করতেই লাখ ডলারের খরচ হয়ে যাচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে ৫-৬ বছরের মধ্যে বাজারে কৃত্তিম মাংস বিক্রী করা সম্ভব হবে (৯) প্রথমদিকে এর দাম খুব বেশী হবে তবে ১৫-২০ বছরের মধ্যেই প্রতিযোগিতামূলক দামে উৎপাদন সম্ভব হবে।

কৃত্তিম মাংস নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আশাকরি পরে কখনো এই বিষয়ে কেউ লিখবেন। এই টেকনোলজী যদি অচিরেই গবেষনাগারের চৌহদ্দী পেরিয়ে বাজারে নিয়মিত হয় তবে সেটা মানব ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী টেকনোলজী হিসেবে বিবেচিত হবে এটা নিশ্চিৎভাবেই বলা যায়। আমরা সংক্ষেপে একটু দেখি যে সমাজ ও জীবনে কৃত্তিম মাংস উৎপাদনের কি ফলাফল হতে পারে।

প্রথমেই আসা যাক প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে। আগেই বলেছি যে পৃথিবীতে এই মুহুর্তে মানুষের খাদ্যের জন্যে কয়েক বিলিয়ন পশু পালন করা হচ্ছে। আমরা অনেকেই যেটা জানি না সেটা হলো যে এই মাংস উৎপাদনের জন্য আমাদের কি পরিমানে মাশুল দিতে হচ্ছে। এক হিসেবে এক পাউন্ড ওজনের একটি গরুর মাংসের স্টেক তৈরী করতে খরচ হয় ২৫০০ গ্যালন পানি, ১২ পাউন্ড খাদ্যশস্য আর এক গ্যালন জ্বালানী তেল পরিমানে এনার্জি (১০) পৃথিবীর যাবতীয় চাষযোগ্য জমির তিরিশ শতাংশই ব্যবহার হয় পশুখাদ্য উৎপাদনে। কেবল দ: আমেরিকাতেই বছরে ৫০ লাখ একর জমি পরিষ্কার করা হয় পশুর চারনভূমির জন্যে। গাবাদিপশু থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস গ্লোবাল ওয়ার্মিং এ ভূমিকা রাখছে পৃথিবীর যাবতীয় গাড়ী থেকে নির্গত গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশী। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে যদি পশুর মাংস সম্পূর্ন বর্জন করে কৃত্তিম মাংস বিকল্প হিসেবে গৃহীত হয় তবে, পশুজনিত গ্রীনহাউস গ্যাস এর পরিমান কমে দাড়াবে বর্তমানের ৪%, মাংসের পিছনে এনার্জি খরচ হবে অর্ধেকেরও কম, জমির দরকার হবে বর্তমানের ১% আর পানির পরিমান ৪% (৮)।

মাংস কৃত্তিমভাবে উৎপাদন শুরু হলে প্রকৃতিতে অনেক প্রভাব ফেলবেই তবে তা তুচ্ছ হবে মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনের তুলনায়। লক্ষবছরের বিবর্তনে আমরা জীনের দাস হয়ে ইচ্ছে করলেও মাংস খাওয়া ছাড়তে পারছি না। আমরা পশু পালন ও হত্যার নিষ্ঠুরতা জেনেও অগ্রাহ্য করি এটা সম্পূর্ন প্রাকৃতিক বলে, ঠিক যেমন অ্যারিস্টোটল আড়াই হাজার বছর আগে বলেছিলো দাস প্রথা সমাজের স্বাভাবিক অবস্থা। আমরা নিজেদের প্রবোধ দেই যে পশুদের সংবেদনশীলতা কম, তারা ভয়-যন্ত্রনা আমাদের মতো করে অনুভব করে না, ঠিক যেমনটি একসময়ে শ্বেতাংগ যাজক, নেতারা বলতো যে কালো আফ্রিকানরা ইউরোপীয়দের মতো যন্ত্রনা পায় না, তাদের আত্মাই নেই কিংবা থাকলেও নিম্নপর্যায়ের। যেমুহুর্ত থেকে আমাদের সামনে মাংসের বিকল্প চলে আসবে যে সময় থেকেই আমাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ঢেউ শুরু হবে।

আমরা এতোদিন যারা পশুদের বুদ্ধিমত্তা, যন্ত্রনা, আতংক এগুলিকে অগ্রাহ্য করেছি সেগুলি তখন নতুন করে আমাদের মধ্যে আবেদন সৃষ্টি করবে। Factory Farming এর ভয়ংকরতা আমাদের সামনে নগ্ন হয়ে দেখা দিবে। পশুমাংস বিরোধীরা মিডিয়ায় ও পথে-রেস্তোরায় তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলবে। যারা এর পরেও পশুমাংস খেতে চাইবে তাদের অবস্থা হবে অনেকটা এখন কার দিনে জাপানের কিছু অন্চলের ডলফিনভোজীদের মতো। লোকচক্ষুর অন্তরালে, মিডিয়াকে ব্যান করে, গোপনে ডলফিন হত্যা করে ট্র‍্যাডিশন ধরে রাখার চেষ্টা করার মতো। সবচেয়ে বেশী বাধা আসবে ধর্মীয় পক্ষ থেকে। ধর্মের প্রথার দাবী তুলে তারা পশুহত্যা চালিয়ে যেতে চাইবে। কিন্তু তাদের অবস্থা হবে কদিন আগেও যারা বহুবিবাহ, শিশুবিবাহ, ক্রীতদাস প্রথা এসব চালিয়ে রাখতে চাইতো ধর্মের অজুহাত দেখিয়ে, তাদের মতো। বিশ্বের মানুষের জনমতের তীব্র চাপের বিরুদ্ধে চলা বেশীদিন সম্ভব হবে না।

এটা চিন্তা করতে বেশী কল্পনা করা প্রয়োজন পরে না যে আজ থেকে ৪০-৫০ বছর পরে হয়ত আজকের Factory Farming কে দেখা হবে নাৎসীবাহিনীর Concentration Camp এর Gas Chamber এর মতো। আর আমরা ভবিষৎ জেনারেশনের সামনে প্রতিভাত হবো সেই সময়ের সাধারন জার্মানদের চেয়েও অনেক নীচু হিসেবে। কারন সেসময়ে জার্মানরা কিছুটা জেনে, কিছুটা না জেনে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলো ভয়ে এবং এটা তাদের ব্যাক্তিগত ব্যাপার নয় এই ভেবে। কিন্তু আমরা আজকে Factory Farming এর ভয়াবহতা জেনেও শুধু চোখ বুজে নেই, আমরা তার ফলাফল সানন্দে উপভোগ করছি খাবার টেবিলে। আজকে যেমন আমরা Django Unchained ছবিতে দাস মালিক ও তার পরিবার কেমন করে প্রতিহিংসাকামী দাসের হাতে উপযুক্ত শাস্তি পাচ্ছে, এটা দেখে শিহরিত হই, ঠিক এমন করেই হয়তো ৫০ বছর পরে আজকের Factory Farming মালিকের এবং সাধারন মাংসভোজী লোকজনের করুন পরিনতি চিত্রিত হতে দেখে তখনকার লোকজনেরা উল্লসিত হবে।

আমার এই দীর্ঘ লেখাটির উদ্দ্যেশ্য পাঠকদের মাংস বর্জন করে নিরামিশশাসী হওয়ার জন্যে উদ্ধুদ্ধ করা নয়। আমি নিজেও মাংসভোজী, তবে চেষ্টা করছি পশুমাংস যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া এড়িয়ে চলতে। এই লেখাটির চিন্তা মাথায় আসে সেই ইতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর চিন্তা থেকেই। আমরা যারা আজকের সময়ের খন্ডে বসে অতীতের মানুষের নৈতিক দীনতা নিয়ে চিন্তা করি, তারা এটা চিন্তা কমই করি যে ভবিষৎ এর মানুষও বর্তমানের আমাদেরকে এরকম হীনভাবেই দেখবে কোন না কোন দিক থেকে। আমাদের বোঝা উচিৎ যে আমরা সবাই সময়ের সন্তান. আমরা মানুষের সভ্যতার যাত্রার সময়প্রবাহের একটি ছোট্ট স্লাইসে বাস করছি। Presentism আমাদের চিন্তা অনেক বেশী আচ্ছন্ন করে রাখে। আমাদের অতীত ইতিহাস আর বর্তমান সমাজ আমাদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানসিকতার গঠনে বড়ো ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ইতিহাসের দাস হলেও আমাদের মধ্যে ক্ষমতা রয়েছে সময় ও স্থানকে অতিক্রম করে যাওয়ার। এটাই মানুষের সভ্যতার সাফল্য। আমরা সংষ্কৃতির পুন্জীভবনের সুবাদে অতীতের মানুষের উপরে ভর করে পুরো মহাবিশ্বকে, তার অতীত-বর্তমান-ভবিষৎ নিয়ে ধারন করার চেষ্টা করতে পারি। আমাদের সেকারনেই চেষ্টা করা উচিৎ যে আমাদের বর্তমানের মানসিকতা, রীতি, নীতি, আচরন যেনো স্থান ও কালের আন্চলিকতায় বাধা না পরে যতদূর সম্ভব সময়ের সাথে শ্রেয়তর বলে বিবেচিত হতে পারে।

REFERENCES

(1) http://cghs.dadeschools.net/african-american/europe/slave_trade.htm

(2) http://www.nalis.gov.tt/Default.aspx?TabId=189&PageContentID=222

(3) http://www.nytimes.com/2013/06/12/business/robert-w-fogel-nobel-winning-economist-dies-at-86.html?pagewanted=all&_r=0

(4) http://www.measuringworth.com/slavery.php

(5) http://www.farmsanctuary.org/learn/someone-not-something/

(6) http://www.peta.org/issues/animals-used-for-food/pigs-intelligent-animals-suffering-in-factory-farms-and-slaughterhouses.aspx

(7) http://boingboing.net/2011/06/30/richard-dawkins-on-v.html

(8) http://www.guardian.co.uk/commentisfree/2012/jan/22/cultured-meat-environment-diet-nutrition

(9) http://www.earthsave.org/environment.htm

Advertisements

Published on: মার্চ 10, 2013 @ 8:55

Permalink: http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=34195

উগো চাবেস এর অকালে মৃত্যুর পরে বাংলাদেশে অনেকে ন্যাযত: শোক করেছেন। কিন্তু তার অবদানের কথা বলতে গিয়ে যে তীব্র উচ্ছাস দেখা গেছে তার যুক্তি সংগতা নিয়ে প্রশ্ন খুব একটা আসে নি। স্বভাবগত ভাবে পশ্চিমবিদ্বেষী বাংলাদেশীদের কাছে চাবেস যে হিরো হবেন এটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশীদের কাছে গাদ্দাফী, সাদ্দাম, আহমেদিনাজাদ এমনকি বিন লাদেন ও হিরো। আমি এখানে চাবেস এর নিন্দা করার জন্যে এই পোস্ট লিখছি না। শুধুমাত্র তার অবদানকে কিছুটা বাস্তবতার নিরীখে দেখার জন্যে এই ছোট পোস্ট টি। মূলত অর্থনীতির কিছু দিকই আমি উল্লেখ করবো।

বেনেসুয়েলা’র গত এক যুগের অর্থনীতি কে বুঝতে হলে সবচেয়ে ভালো হবে এর কাছাকাছি আরেকটি দেশের অর্থনীতির সাথে তুলনা করলে। ল্যাটিন আমেরিকার আরেকটি দেশ মেক্সিকো। কাছাকাছি দেশ ও ইতিহাস ছাড়াও এই দুটি দেশের মধ্যে বড়ো মিল হলো যে দুটি দেশই অন্যতম তেল রপ্তানীকারী দেশ। ২০০৯ সালে বেনেসুয়েলা ছিলো ১৩ তম তেল রপ্তানীকারক ( ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন) আর মেক্সিকো ছিলো ১৭ তম ( ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল) [1] উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বেনেসুয়েলা তে পাওয়া গেছে পৃথিবীর সম্ভবত সবচেয়ে বড়ো তেলের ভান্ডার। নতুন হিসাব অনুসারে বেনেসুয়েলা’র পরিক্ষীত তেলের মজুদ সৌদী আরবের চেয়েও বেশী।

<img src=”http://topforeignstocks.com/wp-content/uploads/2013/02/Proven-Oil-Reserves-by-Country.png&#8221; alt=”Oil Reserve By country” />

http://topforeignstocks.com/2013/02/04/top-proven-oil-reserves-by-country/

মেক্সিকো আর বেনেসুয়েলা তুলনা করা খুব উপযোগী একারনে যে গত একদশকে এই দুটি দেশ অর্থনীতির দিক দিয়ে সম্পূর্ন দুটি ভিন্ন দিকে যাত্রা করেছে। ৯০ এর দশকে আমেরিকা আর কানাডার সাথে মুক্ত বাজার নাফটা ( NAFTA) চুক্তির পর মেক্সিকো তার অর্থনীতিকে অনেকটাই উন্মুক্ত দেয় বিদেশী ইনভেস্টমেন্ট এর জন্যে। অনেক রাষ্ট্রীয় সেক্টরকে বিরাষ্ট্রীয়করন করা হয়। অন্যদিকে বেনেসুয়েলা’র অর্থনীতির দিকপথ তো মোটামুটি সবার জানা।
উল্লেখ করে নেয়া দরকার যে মেক্সিকোর বর্তনাম জনসংখ্যা সাড়ে এগারো কোটি আর বেনেসুয়েলার তিন কোটি। মেক্সিকোর জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশী।

এখন এক যুগ পরে এই দুই অর্থনীতির কিছু সংক্ষিপ্ত তুলনা দেখা যাক। [2]

২০০০ ২০০১ ২০০৯ ২০১০ ২০১১
বাৎসরিক মাথাপিছু আয় (পিপিপি)
মেক্সিকো ৮৭৮০ ৮৮৯০ ১৩৫৩০ ১৪৩৫০ ১৫৩৯০
বেনেসুয়েলা ৮৩৮০ ৮৬৬০ ১২৩৩০ ১১৯৯০ ১২৪৩০
মোট রপ্তানীর মধ্যে তেল রপ্তানীর অংশ
মেক্সিকো ৯% ৮% ১৩% ১৪% ১৬%
বেনেসুয়েলা ৮০% ৮০% ৯৫% ৯৩%
তেল ছাড়া অন্য পন্য ও সার্ভিস এর
রপ্তানীর বৃদ্ধি
মেক্সিকো % ১৬% -৩% -১৩% ২১% ৬%
বেনেসুয়েলা ৫% -৩% -১% -১৩% -১২%

উপরের চার্ট টিতে যদি কারও বুঝতে কিছু অসুবিধা হয় তবে আরও একটি সহজ পরিসংখ্যান দিচ্ছি, সৌদি আরবের বাৎসরিক রপ্তানীর ৯০% আসে তেল গ্যাস থেকে, বেনেসুয়েলার ৯৫% ।
এই অগাধ তেলের রিজার্ভ এর কারনে চাবেস এর অন্তর্ধান এর পরেও বেনেসুয়েলা যে অচিরেই পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ এ পরিনত হবে এব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই।

অন্যদিকে বর্তমানে মেক্সিকোর রপ্তানীর প্রধান তিন পন্য হলো ইলেকট্রনিক্স, গাড়ী এবং মেশিনারী। এই তিন ক্যাটেগরীতেই সর্বমোট রপ্তানীর প্রায় ৬০%।
বর্তমানে মেক্সিকোর ম্যানুফ্যাকচারিং এতোটাই শক্তিশালী যে মেক্সিকোর রপ্তানী বানিজ্য বিশ্বের রপ্তানী সুপারপাওয়ার চীনকে তীব্র প্রতিদ্বন্দিতা করছে।
Mexico: China’s unlikely challenger
By Adam Thomson
Latin America’s second-largest economy has emerged as a powerful exporter
http://www.ft.com/cms/s/0/9f789abe-023a-11e2-b41f-00144feabdc0.html#axzz2N6BlnKmu

মেক্সিকোর অর্থনীতি বেনেসুয়েলার তুলনায় অনেক ডাইভার্সিফাইড ই শুধু নয় অনেক এফিশিয়েন্ট ও। অর্থনীতি তে একটা দক্ষতার হিসাব আছে GDP per unit of energy use যেটা হিসাব করে যে একটি অর্থনীতি এক কেজি সমপরিমান তেল এর এনার্জি খরচ করে অর্থনীতে কি পরিমানে সম্পদ সৃষ্টি করে। এই হিসাবে দেখা যায় যেখানে মেক্সিকো এক কেজি তেল থেকে ৮ ডলারের মতো জিডিপি সৃষ্টি করে সেখানে বেনেসুয়েলা করে ৪ ডলার মাত্র। এখানে এটা উল্লেখ করাও দরকার যে গত এক দশকে মেক্সিকো’র অর্থনীতির বৃদ্ধির এক বড়ো কারন হলো আমেরিকার সাথে ফ্রী ট্রেড চুক্তি এবং মেক্সিকোতে আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট। ২০০১ সালে আমেরিকা নাফটা চুক্তিকে সম্প্রসারন করে পুরো দক্ষিন আমেরিকা (কিউবা বাদে) কে এর আওতায় আনতে উদ্যোগ নেয়। প্রধানত চাবেস এর তীব্র বিরোধিতার কারনেই এই সম্প্রসারন সফল হয় নি।

উগো চাবেস বেনেসুয়েলার জন্যে অনেক অবদান রেখেছেন এব্যাপারে সন্দেহ নেই। যারা ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাস সম্পর্কে জানেন তারা জানেন যে পৃথিবীতে মধ্যপ্রাচ্যের পর সম্ভবত এই অন্চলটিই অর্থনীতির বিবর্তনে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিলো। ৫০০ বছর আগে স্পেনিশ-পর্তুগীজ কলোনীর পত্তনের পর থেকেই এই অন্চলের অর্থনীতিগুলো মোটামুটি ভাবে বড়ো বড়ো অভিজাত পরিবারগুলির কুক্ষিগত ছিলো। এই অভিজাততন্ত্রের হাত থেকে মুক্তির জন্যে গত ২০০ বছর ধরেই সংগ্রাম চলছে। কোন কোন দেশ এই অর্থনীতির পরিবর্তনে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে অন্যদিকে কোস্টারিকা, চিলি এসব দেশ অনেক এগিয়ে গেছে বেশ আগেই। বেনেসুয়েলার অভিজাত তন্ত্রে আঘাত হানা চাবেস এর বড়ো সাফল্য সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

তবে চাবেস এর অর্থনীতিকে সফল বলতে গেলে গাদ্দাফী, সৌদী বাদশাহ এদেরকেও সফল অর্থনীতির দিকপাল বলতে হবে। পায়ের নীচে তেলের অগাধ সাগর থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে উদ্ভট তন্ত্রও ব্যর্থ হতে অনেক সময় লাগে।

References:

[1]http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_countries_by_oil_exports

[2] http://www.worldbank.org/

http://www.ft.com/cms/s/0/9f789abe-023a-11e2-b41f-00144feabdc0.html#axzz2N6BlnKmu

<strong>আমার গনহত্যা তোমার গনহত্যার চেয়ে বড়ো</strong>
-সফিক

Permalink: http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=27909

Originally Published on: অাগস্ট 2, 2012 @ 3:05 in 

http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=27909

 

খেয়াল নেই ঠিক কোন সময়টিতে, আট দশ বছর আগে সিএনএন ইন্টারন্যাশনালের একটা নিউজ প্রোগ্রাম দেখছিলাম। সংবাদে একটা প্যানেল আলোচনা চলছিলো গনহত্যা নিয়ে। সম্ভবত প্যানেলে আফ্রিকার রুয়ান্ডা গনহত্যার বিচারের একটি রায় নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। প্যানেলে মডারেটর ছাড়াও একজন আফ্রিকান, একজন জুইশ এবং সম্ভবত একজন ক্যাম্বোডিয়ান অথবা একজন আর্মেনিয়ান অংশ নিয়েছিলো। আলোচকরা সবাই গনহত্যা ঠেকানোর জন্যে আর্ন্তজাতিক সমাজের দৃঢ়তার এবং গনহত্যার সুষ্ঠু বিচারের আবশ্যকীয়তা নিয়ে একমত হয়ে সৌহার্দের সাথে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কথাপ্রসংগেই একজন প্যানেলিস্ট রুয়ান্ডার গনহত্যাকে দ্বিতীয় মহাযু্দ্ধের সময়ে ইউরোপের ইহুদীদের উপরে চালানো গনহত্যাযজ্ঞ হলোকস্টের (Holocaust) সাথে তুলনা করলেন। আর যায় কোথায়! প্যানেলের জুয়িশ মহিলাটি মুহুর্তের মধ্যে জ্বলে উঠলেন। গলা চড়িয়ে বলা শুরু করলেন হলোকস্ট এর সাথে আর কোনো গনহত্যার তুলনাই হতে পারে না। নাৎসীদের পরিচালিত হলোকস্ট, যা বর্তমানে ইহুদীরা শোয়াহ (Shoah যার অর্থ হিব্রুতে catastrophe) বলতে প্রেফার করে, ইতিহাসে একক, অনন্য একটি ঘটনা। মহিলা ফিরিস্তি দেয়া শুরু করলেন কি কি কারনে হলোকস্ট অতুলনীয় এবং অনন্য। তার কথা তোড়ে অন্যেরা আর কোনো কিছু বলারই ফুরসত পেলো না।

যারা পশ্চিমের লেখালেখি আর মিডিয়া জগতে গনহত্যা, হলোকস্ট এবং এসংক্রান্ত বিশ্বরাজনীতি নিয়মিত অনুসরন করেন, তাদের কাছে উপরের ঐ জুয়িশ মহিলার আউটবার্স্ট একটি অতিপরিচিত ঘটনা। জুয়িশ ইন্টেলেকচুয়াল এবং সামাজিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের একটি অংশ গত কয়েক দশক ধরে ইতিহাসে হলোকস্টের অনন্য অবস্থানকে ধর্মীয় মৌলিক বিশ্বাসের মতোই আকড়ে ধরে আছে এবং সবার মাঝে প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রচার করে আসছে। এদের কাছে হলোকস্টের অনন্য-একক অবস্থান জুয়িশ পরিচয়েরই অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিনত হয়েছে।

দ্বিতীয় মহা্যুদ্ধের পর আজ পর্যন্ত হলোকস্ট নিয়ে যতো আলোচনা, গবেষনা, শিল্প-সাহিত্য, প্রচার হয়েছে, বিংশ শতাব্দীর আর কোনো গনহত্যা নিয়ে তার ৫ শতাংশও হয় নি। এর অন্যতম কারন হলো এই গনহত্যার শিকার জাতিগোষ্ঠী এবং গনহত্যা পরিচালনাকারী জাতি দুটিই আধুনিক বিশ্বসমাজ সংষ্কৃতিতে সবচেয়ে প্রমিনেন্ট জাতিগুলির অন্যতম। হলোকস্ট নিয়ে লেখালেখি-গবেষনার পরিমান ইতিহাসের অন্য যেকোনো ঘটনার চেয়ে বেশী, এই ধারাটির ব্যাপ্তি এতো বিশাল যে গত দু্ই দশকে ‘হলোকস্ট কেনো অতুলনীয় ও অনন্য’ এই প্রশ্নটিই এক স্বতন্ত্র, প্রতিষ্ঠিত গবেষনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। গুগলে ‘Holocaust genocide unique’ এই শব্দগুলো দিয়ে সার্চ দিলে এই বিষয়ে অজস্র পাব্লিকেশনের লিংক এবং অনেক ইন্টারেস্টিং আর্টিকেল পাওয়া যাবে।
অজস্র তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি-তথ্যের মধ্যে হলোকস্ট এর অনন্যতার দাবীদাররা কয়েকটি প্রধান পয়েন্টই ঘুরে ফিরে উপস্থাপন করে।
হলোকস্ট এর অনন্যতার দাবীদাররা প্রথমেই যে যুক্তিটি তুলে ধরেন তা হলো ইতিহাসে হলোকস্টই একমাত্র ঘটনা যেখানে একটি পুরো জাতিকে আমূলে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিলো (১)।
নাৎসীরা ও তাদের দোসরেরা ইউরোপের প্রতিটি ইহুদীকে , বৃদ্ধ-নারী-শিশু নির্বিশেষে, মেরে ফেলার লক্ষ নিয়েছিল। বিশ্ব জয় করতে পারলে তারা এই নিধনযজ্ঞ সারা পৃথিবীজুড়েই বিস্তৃত করতো। দ্বিতীয় প্রধান যুক্তিটি হলো, ইতিহাসে হলোকস্টই একমাত্র গনহত্যা যার কোনো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক উদ্দ্যেশ্য ছিলো না। নাৎসীরা ইহুদীদের সরিয়ে দিয়ে তাদের ভূমি দখল করতে চায় নি। নাৎসীরা যদিও ধনী ইহুদীদের সম্পদ, আর্ট, জুয়েলারী আত্মসাৎ করেছিল, কিন্তু এটা তাদের মূল লক্ষ্যের মধ্যে ছিল না। হলোকস্টের ৯০% শিকারই পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী ইহুদী সম্প্রদায়। ইহুদীরা নাৎসীদের ইউরোপ জয়ের পথেও কোন সামরিক বাধা ছিলো না। নাৎসী নিধনযজ্ঞ সবচেয়ে তুঙ্গে উঠেছিলো ১৯৪৩ এর মধ্য হতে ১৯৪৪ এর শেষ পর্যন্ত। হাজার হাজার ট্রেন, লক্ষের বেশী সৈন্য,পুলিশ, গার্ড নিয়োজিত ছিলো সারা ইউরোপ থেকে ইহুদীদের ধরে এনে ডেথ ক্যাম্প গুলোতে মেরে ফেলার কাজে। অথচ এই সময়টাতে জার্মান সেনাবাহিনী রাশান, ইটালিয়ান, ফরাসী সব ফ্রন্টেই তীব্র লোকবল, সরঞ্জাম, যানবাহন সংকটে ভুগছিলো এবং মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকেপ্রবল সামরিক চাপের মধ্যে ছিলো। সামরিক প্রয়োজনীয়তার চেয়েও ইহুদী নির্মূলের প্রায়োরিটি ছিলো বেশী। আরেকটি অন্যতম যুক্তি হলো যে হলোকস্টই প্রথম গনহত্যা যেখানে জাতি নির্মূলের জন্যে আধুনিক বিজ্ঞান-সভ্যতার পূর্ণ প্রয়োগ করা হয়েছিলো। নাৎসীদের পরিচালিত গনহত্যা ছিল না ইতিহাসের এর আগের গনহত্যা গুলির মতো হিংস্র-বন্য বর্বরতায় পূর্ণ রক্তস্রোত, বরং এটা ছিল সর্বোচ্চ উন্নত একটি দেশের, তার আমলাতন্ত্র, ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং ইন্ডাস্ট্রির সুপরিকল্পিত সমন্নয় করে ইউরোপ থেকে কোটি মানুষকে সবচেয়ে এফিশিয়েন্ট ঊপায়ে নির্মূল করার প্রয়াস।

হলোকস্ট এর অনন্যতা পক্ষে বিপুল প্রকাশনা-প্রচারনা’র বিপরীতে বেশ কয়েকজন ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ উঠে দাড়িয়েছেন হলোকস্ট কে ইতিহাসে কোনো একক-অনন্য অবস্থান দেয়ার বিরূদ্ধে। রুডলফ রুমেল (http://en.wikipedia.org/wiki/Rudolph_Rummel) বিংশ শতাব্দীর গনহত্যা বিষয়ে একজন বিশ্বস্বীকৃত বিশেষজ্ঞ। রুমেল এর মতে ইতিহাসে তো নয়ই, এমনকি বিংশ শতাব্দীর গনহত্যাগুলির মধ্যেও হলোকস্ট বিশেষ স্থান পেতে পারে না।(৫) রুমেল দেখিয়েছেন বিংশ শতাব্দীতেই স্ট্যালিন (৪.৩ কোটি), মাও (৩.৭ কোটি), হিটলারের (২.১ কোটি) এর চেয়ে অনেক বেশী সিভিলিয়ান এর সরাসরি মৃত্যুর জন্যে দায়ী। আর নাৎসীদের হত্যার লিস্টে ইহুদীদের (.৫৩ কোটি) চেয়ে অনেক বেশী রয়েছে পূর্ব ইউরোপের স্লাভ জনগোষ্ঠী (১.০৫ কোটি)।

এছাড়া, হলোকস্টে যেমন ইহুদীদের কেবল তাদের এথনিক, রক্তের সম্পর্কের জন্যে টার্গেট করা হয়েছিলো তেমনি নাৎসীরা টার্গেট করেছিলো জিপসী ও স্লাভদের তাদের জাতীয়তার জন্যেই, ৭১ এ পাকিস্তানীরা টার্গেট করেছিলো হিন্দু ও বাঙ্গালীদের, রুয়ান্ডায় হুটুরা টার্গেট করেছিলো টুটসি দের। হলোকস্টকে অনন্য দাবীর বিরুদ্ধে সোচ্চার আরেকজন ইতিহাসবিদ হলেন ডেভিড স্ট্যানার্ড, যিনি উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকার আদিবাসীদের উপরে ইউরোপীয়ান কলোনিয়ালিস্টদের পরিচালিত গনহত্যা নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন।(১) ১৬ শ শতাব্দী থেকে ১৯ শ শতাব্দী পর্যন্ত স্প্যানিশ, বৃটিশ, আমেরিকানদের হাতে প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি কোটি আদিবাসীর মৃত্যু হয়। হলোকস্টে ইউরোপের ৬০ থেকে ৬৫ % ইহুদী মেরে ফেলা হয়, আমেরিকায় ৪ শতকের গনহত্যায় আদিবাসীদের সংখ্যা প্রি-কলাম্বিয়ান সময় থেকে ৯৫% কমে যায়। এমনকি দ্রুতহারে গনহত্যায়ও হলোকস্ট অনন্য নয়। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় মাত্র ৩ মাসে হুটু ঘাতকেরা সাড়ে আট লক্ষেরও বেশী প্রতিবেশী টুটসি জাতিভুক্তদের হত্যা করে। জনগোষ্ঠীকে আমূল নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যও হলোকস্টের অনন্য বৈশিষ্ট্য নয়। ইতিহাসে অনেকবারই বিভিন্ন স্থানে একটি পুরো জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছিলো এবং অনেকক্ষেত্রে সেসব গনহত্যা তাদের লক্ষ্যে সফলও হয়েছিলো। এছাড়া আরো অনেকেই বলেছেন নৃশংসতা, ব্যাপকতা, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তি, কোনো দিক দিয়েই হলোকস্টকে গনহত্যার ইতিহাসে অনন্য বলা যাবে না।

হলোকস্ট এবং অন্যান্য গনহত্যা গুলির তুলনামুলক আলোচনায় হাজার হাজার পাতা লেখা যাবে এবং সেটা খুব একটা ইন্টারেস্টিং আলোচনাও হবে না। এর চেয়ে অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং বিশ্বসভ্যতায় হলোকস্ট এর শিক্ষা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ইহুদীদের মধ্যে পরিষ্কার বিভক্ত দুটি ধারার প্রতিক্রিয়া।

ইজরায়েল ও অন্যান্য বিভিন্ন দেশের ইহুদীদের এর বড়ো অংশের কাছে হলোকস্ট এতোই অনন্য যে এটা এখন ধর্মীয় বিশ্বাসের পর্যায়ে চলে গেছে। এই অংশটি হলোকস্টকে সভ্যতার একক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তারা এতোই বদ্ধপরিকর যে তাদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো কিছুকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে তারা নারাজ। হলোকস্ট-অনন্যতার দ্বাররক্ষী এই হাই প্রিস্ট দের বিভিন্ন উক্তি ও কার্যকলাপের এক লম্বা লিস্ট পাওয়া যাবে ৬ নং রেফারেন্সের The Holocaust and Genocide আর্টিকেল টিতে। আর্টিকেলটি থেকে কয়েকজনের কিছু উক্তি,

আমেরিকার হলোকস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের চেয়ারম্যান, “regarded comparison of the Holocaust with any other form of genocide as ‘blasphemous, as well as dishonest.’”।

“Of all he events in human history,” declares Ivan Avisar, “none is more compelling and disturbing than the Holocaust… The Holocaust was a unique or unprecedented historical experience… Hitler’s intent to exterminate an entire people is incomparable to any other episode of malice in the annals of human history.”

“We are not comparable. We are unique…, “ declared Abba Hillel Silver, “This fact is the one key to an understanding of Jewish experience. To attempt to fit us into the framework of the commonly-held conceptions of race and culture, to liken us to other nations, is to miss the very quintessence of Jewish culture, to overlook the essential text and thesis of our life.”

হলোকস্ট সারভাইভার এলি ভিজেল, যিনি পশ্চিমা মিডিয়ায় বহুল পরিচিত তার আত্মজীবনী ‘নাইট’ এর জন্যে এবং ইজরায়েল ও গনহত্যা বিষয়ে তার মতামতের জন্য, বলেছিলেন,
“To cheaply universalize the Holocaust would be a distortion of history,” says Elie Wiesel, and then, in vintage Orwellian doublespeak, “The universality of the Holocaust lies in its [Jewish] uniqueness.’ (৬)

হলোকস্টকে অনন্য রাখার চেষ্টা ইউরোপ-আমেরিকার একাডেমিক জগৎ-এও প্রবল। অনেক ইউনিভার্সিটিতে মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে স্পেশাল হলোকস্ট চেয়ার যাদের মূল কাজই হলো ইতিহাসে হলোকস্ট এর অনন্য অবস্থান প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাওয়া। এছাড়া ইতিহাস ডিপার্টমেন্ট গুলিতে যেসব ঐতিহাসিক হলোকস্টকে অনন্য স্বীকার করতে নারাজ, তাদের মার্জিনালাইজ করার সক্রিয় চেষ্টাও রয়েছে। জন ফক্স নামের একজন হলোকস্ট এর কলেজ কোর্স শিক্ষকের মতে, “Some historians or writers are deemed acceptable for entry into the fold of the chosen: if you accept the totally absurd uniqueness theory…, not only are you home dry but if you are non-Jewish you are actually feted. If you don’t, you are excluded and damned to hell in terms of your profession.” (৬)

শুধু একাডেমিয়া ও মিডিয়াতেই হলোকস্ট এর অনন্যতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্বাসীরা আর্ন্তজাতিক রাজনীতি, সংষ্কৃতি, সামাজিক পরিমন্ডলেও অত্যান্ত সক্রিয়। দঃ আফ্রিকার আর্কবিশপ ডেসমন্ড টুটু, বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতা এবং শান্তিতে নোবেলজয়ী, বেশ কয়েকবার ইহুদীদের এই গোষ্ঠীর আক্রমনের শিকার হয়েছেন তার দেশের বর্ণবাদী সরকারকে নাৎসীদের সাথে তুলনা করায়। তার নিজের ভাষায়,
“There is a kind of Jewish arrogance,” says Tutu, “one can only call it that… I sometimes say that apartheid is as evil as Nazism and there have been Jews who say I am insulting them. Jews seem to think they have a corner on the market of suffering.” (৬)

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার হলোকস্ট এর এক স্মারক বক্তৃতায়, ইহুদীদের সাথে নাৎসী গণহত্যার অন্যান্য ভিক্টিমদের স্মরন করায় বিতর্কের মুখে পড়েন। জেরুজালেমের হিব্রু ইঊনিভার্সিটির প্রফেসর এহুদা বায়ের বলেন কার্টার হলোকস্ট থেকে ইহুদীদের আলাদা করে সর্বব্যাপী ইহুদী বিদ্দেষকে উৎসাহিত করছেন। ডেভিড স্ট্যানার্ড এর কথায়, “To Baer, the simple acknowledgement of the suffering of others constituted Jew-hating.” আমেরিকার বিখ্যাত আফ্রিকান-আমেরিকান নেতা জেসি জ্যাকসন, ১৯৭৯ সালে ইজরায়েল সফরে যেয়ে তীব্র আক্রমনের শিকার হন শ্রেফ এই কারনে যে তিনি হলোকস্টকে ইতিহাসের অনন্য ট্র্যাজেডী না বলে অন্যতম ট্র্যাজেডী বলেন।

অনেকেই ‘সোফি’স চয়েস’ (http://en.wikipedia.org/wiki/Sophie’s_Choice(film)) মুভিটির কথা শুনেছেন। উইলিয়াম স্টাইরনের উপন্যাস থেকে ১৯৮২ সালে বানানো এই ছবিটির মূল চরিত্র এক পোলিশ ক্যাথলিক নারী, যে তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সহ নাৎসী কন্সেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী হয়। মুভিটির সবচেয়ে তুঙ্গ মুহুর্তে একজন নাৎসী অফিসার সোফিকে তার ছেলে অথবা মেয়ে, যে কোনো একজনের জীবন বেছে নিতে বলে। মেরিল স্ট্রিপ মতো অভিনেত্রী, যিনি অজস্র আলোচিত চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং প্রতি বছরেই যার জন্যে অস্কার নমিনেশন থাকে বাধা, তিনি তার জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন এই ছবিটিতে। স্টাইরনের উপন্যাস এবং মুভি দুটোই কিছু ইহুদী সমালোচকদের তোপের মুখে পড়ে হলোকস্ট ও নাৎসী ক্যাম্প কে অইহুদী অভিজ্ঞতা থেকে দেখানোর সাহস করায়। একজন টিপিক্যাল সমালোচকের আক্রমন নিয়ে এক পোলিশ বংশদ্ভুত লেখক বলেছিলেন,’ “Rosenfeld’s attack on… Styron is based on two premises: an unwillingness to see the universal implications of the Holocaust and indignation at Styron’s assumption that a Polish Catholic woman could be viewed as a representative victim of the camps.”। (৬) এই ধরনের ইহুদী সাংষ্কৃতিক ব্যাক্তিরা হলোকস্টকে ইহুদীদের একান্ত নিজস্ব সাংষ্কৃতিক ও নৈতিক উৎস মনে করে থাকে এবং তারা হলোকস্ট এর অন্য ঐতিহ্যে অন্য কোনো জাতিকে সামান্যতম ভাগ বসাতে দিতে নারাজ।

হলোকস্টকে অনন্য করার এই প্রবনতা কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকেই ছিলো না। বরং যুদ্ধের পরে নতুন রাষ্ট্র ইজরায়েল এর অধিকাংশ নাগরিক এর কাছে হলোকস্ট ছিলো লজ্জাজনক একটি অধ্যায়। বিশেষ করে ইউরোপের লক্ষ লক্ষ ইহুদী নাৎসী ক্যাম্পে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ভেড়ার মতো নিশ্চিৎ মৃত্যু মেনে নিলো এই প্রশ্নটি ছিলো প্রকট। সেসময়ে সারভাইভরদের চেয়ে আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যুদ্ধের ইউরোপে যে কিছু ইহুদী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়েছিল তাদের বীরত্বের প্রতি সম্মান জানানো। এই চিত্রটি সম্পূর্ন পাল্টে যায় ১৯৬৭ এর ৬-দিনের যুদ্ধের পর। ইজরায়েল এক মিরাকিউলাস যুদ্ধে মিশর, সিরিয়া, জর্ডানের মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে পশ্চিম তীর, সিনাই, গোলান সহ বিশাল এলাকা জয় করে। এই অভাবিত জয় এর পরে বিশ্বব্যাপী ইহুদীদের বৃহৎ অংশ হলোকস্ট এবং ১৯৬৭’র যুদ্ধকে দেখতে শুরু একই সূত্রে গাথা ঈশ্বরের প্ল্যান হিসেবে। তারা বিশ্বাস শুরু করে হলোকস্ট এর নিদারুন ঘটনার কারনেই এই বৃহত্তর ইজরায়েল ইহুদীদের প্রাপ্য। তারা প্রচার শুরু করে অন্য সব দেশ, জাতি, ইতিহাসের সাথে ইজরায়েলকে এক মাপকাঠিতে মাপা উচিৎ হবে না। অন্যক্ষেত্রে যেটা অন্যায় দখল বলে মনে হতে পারে, ইজরায়েল এর ক্ষেত্রে সেটা ন্যায়সংগত অধিকার। বলাই বাহুল্য যে <strong>বিশ্বসমাজে ইজরায়েল এর আলাদা ট্রিটমেন্ট পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠাই হলোকস্টকে অনন্য ও একক ঘটনা দাবী করার মূল উদ্দ্যেশ্য।</strong> বিশেষ করে ৮০’র দশক থেকে যখন পশ্চীম তীর আর গাজায় ইজরায়েল এর অবৈধ দখল সারা বিশ্বের সমালোচনার মুখে পড়ে তখন থেকে হলোকস্ট এর বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে প্রচারনা বাড়তে শুরু করে।

সেলিব্রেটি লইয়ার এবং হারভার্ড প্রফেসর অ্যালান ডারশোভিৎস এর সরাসরি কথা, “The world owes Jews and the Jewish state [of Israel], which was built on the ashes of the Holocaust, a special understanding.”। (৬) হলোকস্ট এর ঐতিহাসিক জিগমুনড বাউম্যান স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে ইজরায়েল হলোকস্টকে ব্যবহার করে “as the certificate of its political legitimacy, a safe-conduct pass for its past and future policies, and, aboveall, as the advance payment for the injustices it might itself commit.” (১) র‍্যাব্বাই ইয়াকব নিউজনার এর মতে, “The ‘Holocaust’ is the Jews’ special thing, It is what sets them apart from others while giving them a claim upon others. That is why Jews insist on the ‘uniqueness’ of the Holocaust.” (৬) জোনাথন উচারে’র স্বীকারক্তি, “I think there is absolutely no question, as I look at the American Jewish experience that we have appropriated both the Holocaust and the creation of the state of Israel in a mythic fashion. The myth has even been given a name, though not by me, ‘From Holocaust to redemption.’ Israel is a resurrection and all the world’s great religions have a resurrection myth.” (৬)

ইহুদী জাতীয়তাবাদীদের আরেকটি স্পষ্ট প্রবনতা হলো যে তারা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের পক্ষে কোনো পয়েন্ট কে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে হলোকস্ট এর রেফারেন্স টানতে মোটেই দ্বিধা করে না। যখনই সুবিধা হয় তখনই হিটলার, নাৎসী আর হলোকস্ট এর কথা তুলতে দেরী হয় না। কিন্তু তাদের মতের বিরুদ্ধপক্ষ কোনো প্রসংগে হলোকস্টের কথা তুললেই ঢি ঢি পড়ে যায় এই বলে যে অপ্রাসংগিকভাবে হলোকস্ট এর রেফারেন্স টেনে এর পবিত্র স্মৃতির অপমান করা হচ্ছে। তারা এটা বুঝিয়ে দিতে চায় যে হলোকস্ট এর প্রসংগ তোলার অধিকার সবার নেই। এইসব হলোকস্ট এর গেটকিপারদের কার্যকলাপে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আসলে সত্তর বছর আগের গনহত্যা নিয়ে তাদের ততটা আগ্রহ নেই যতটা আগ্রহ আছে বর্তমানের এজেন্ডা বাস্তবায়নে। <strong>বর্তমানের রাজনৈতিক স্বার্থই অতীত ইতিহাসের অনন্যতা দাবীর প্রধান কারন। </strong>

এতক্ষন ইহুদীদের একাংশ কিভাবে হলোকস্ট কে অনন্য প্রতিপন্ন করে ইহুদী জনগোষ্ঠী ও ইজরায়েল এর জন্যে বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে সেটা দেখলাম। হলোকস্ট এর অনন্যতা নিয়ে ইহুদীদের আরেক অংশের প্রতিক্রিয়া না দেখালে চিত্রটা অসম্পুর্ন থাকে।

২০০ বছর আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইহুদীদের উপর হতে নানা রেস্ট্রিকশন তুলে দিয়ে পর্যায়ক্রমে নাগরিক অধিকার দেয়া হতে শুরু হলে নতুন মুক্তি পাওয়া ইহুদী সমাজের মধ্যে দুটি ভিন্ন ধারা ক্রমেই স্পষ্ট হয়। শিল্পবিপ্লব আর আধুনিকায়নে প্রভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল ইউরোপে ইহুদীদের বড়ো অংশ নিজেদের স্বকীয় পরিচয় ধরে রাখার জন্যে হাজার হাজার বছরের পুরনো ট্রাডিশন আরো শক্তভাবে আকড়ে ধরে। অন্যদিকে ইউরোপীয়ান ইহুদীদের আরেকটি বড়ো অংশ ইউরোপীয়ান এনলাইটেনমেন্টে অনুপ্রানিত হয়ে ইউরোপের সেকুলার বুর্জোয়া জীবন-জিবিকার দিকে এগিয়ে যায়। এদের মধ্যে কেউ কেউ একেবারে ইহুদী ধর্ম ত্যাগ করে নামমাত্রে ক্রিশ্চিয়ানিটি গ্রহন করে মেইনস্ট্রীমে মিশে যাবার জন্যে আবার কেঊ কেউ সনাতন ইহুদী ধর্মকে আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের আলোয় নতুন করে ঢেলে সাজাতে চায়। শিক্ষিত ইহুদীদের বিরাট অংশ রিফর্ম জুডাইজম বা প্রগ্রেসিভ জুডাইজমের অনুসারী হয়। সেকুলার এবং রিফর্মড ইহুদীরা দ্রুতই ইউরোপের ব্যবসা-বানিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংষ্কৃতি, সমাজ-রাজনীতিতে সামনের সাড়িতে স্থান করে নেয়। ইহুদীরা সবচেয়ে উন্নতি করে জার্মানভাষী দেশগুলোতেই। ১৯ শতকের শেষ দশকগুলি থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর যুগটিতে ইহুদীরা জার্মান রাষ্ট্র ও সমাজের সাথে এতোটাই একীভূত হয়ে পড়ে যে জার্মান ইহুদীদের বৃহৎ অংশই জায়নিস্ট আন্দোলন (ইহুদীদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্র) এর তীব্র বিরোধী ছিলো।

হাজার বছর ধরে ইউরোপে রাষ্ট্র ও সমাজের অত্যাচারের অভিজ্ঞতা নতুন মুক্তিপাওয়া শিক্ষিত ইহুদীদের বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল করে তোলে মানবিকতাবাদ, যুক্তিবাদ, সাম্যবাদের পক্ষে আর বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে। ইহুদীরা ইউরোপের বিভিন্ন গনতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। ইউরোপে গনতন্ত্র আর সাম্যবাদের পক্ষে ইহুদী বংশদ্ভুতদের অবস্থান এতোটাই প্রমিনেন্ট ছিলো যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিরা আর্ন্তজাতিক সমাজতন্ত্রকে ইহুদী বিশ্ব-ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করতো। ইহুদীদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী ইউরোপের দেশে দেশে জাতীয়তাবাদী, ক্যাথলিক, ফ্যাসিবাদী ইত্যাদি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ইহুদী-বিদ্বেষের মূল কারন ছিলো না। বরং এসব গোষ্ঠী মনে করতো দেশবিহীন, আর্ন্তজাতিকতাবাদী সেকুলার ইহুদীরা ইউরোপের জাতীয়, ধর্মীয়, ঐতিহাসিক পার্থক্য ঘুচিয়ে এক নতুন সমাজ গড়তে চায়।

ইউরোপে হিটলার ক্ষমতায় আসার সময় থেকে সেক্যুলার এবং প্রগতিশীল ইহুদীদের প্রধান আশ্রয় হয়ে পড়ে আমেরিকা। গত সাত দশক ধরেই ইহুদীরা আমেরিকার সবরকমের প্রগতিশীল রাজনীতি, সামাজিক-সাংষ্কৃতিক আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা রেখে আসছে। বর্ণবাদ বিরোধীতা, যুদ্ধ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা, সব রকমের ডিসক্রিমিনেশন এর বিরোধীতা, ইত্যাদি ইস্যুতে ইহুদীদের অধিকাংশ সবসময়েই প্রগতিশীলতার পক্ষে ছিলো। এর মূল কারন আমেরিকার শিক্ষিত-প্রতিষ্ঠিত ইহুদীদের অধিকাংশ প্রগ্রেসিভ, রিফর্ম জুডাইজম এর অনুসারী। রিফর্ম জুডাইজম এর মানবিক ও আর্ন্তজাতিক প্রিন্সিপাল গুলি নিয়ে পরে কখনো আলোচনা করা যাবে।

আমেরিকার প্রগ্রেসিভ ইহুদী বুদ্ধিজীবি, সাংষ্কৃতিক ব্যাক্তিদের বেশীরভাগই মনে করেন যে হলোকস্ট কে অনন্য হিসেবে দেখা সমগ্র মানবজাতি তো বটেই এমনকি ইহুদীদের জন্যেও অত্যেন্ত ক্ষতিকর। কোনো কিছুকে অনন্য-একক প্রতিপন্ন করা মানেই সেটাকে যুক্তি, ইতিহাস, সমাজবিদ্যার নিয়মের বাইরে অবস্থান দেয়া, সেটাকে অব্যাখ্যেয় (Inexplicable) মেনে নেয়া। হলোকস্টকে অব্যাখ্যেয় বললে আমরা বুঝতে ব্যর্থ হবো মানুষের মধ্যে এরকম ভয়াবহ নৃশংসতার উৎস কোথায়। কিছুকে অনন্য বলার অর্থ সেটি পুনরায় অন্যকোথাও ঘটার সম্ভাবনাকে অগ্রাহ্য করা। কিন্তু আমরা বার বার দেখেছি যে তীব্র বিদ্বেষে কোনো একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ণ করার প্রচেষ্টা কেবল নাৎসীদের ট্রেডমার্ক নয়। একই ভয়ংকরতা দেখা গিয়েছে পরে অন্য স্থানে, অন্য জাতির মধ্যে। বিভিন্ন গনহত্যার শিকার গোষ্ঠীদের মধ্যে যন্ত্রনার পার্থক্য করা অসাধু এবং অনৈতিক। নাৎসী ডেথ ক্যাম্পের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাথে স্ট্যালিনের গুলাগের অভিজ্ঞতার পার্থক্য খোজা অনুচিত, বিশেষ করে যখন দুই ক্ষেত্রেই প্রায় অবশ্যাম্ভী পরিনতি ছিলো মৃত্যু। প্রগ্রেসিভদের মতে হলোকস্ট কে অনন্য দাবী করে ইহুদী জাতীয়তাবাদীরা কেবল অন্য গনহত্যার ভিক্টিমদের অপমানই করছে না, ইহুদীদের প্রতি অন্যান্য জাতির বিরক্তিকেও উস্কে দিচ্ছে। তারা মনে করে হলোকস্ট ভিক্টিম হিসেবে ইহুদীদের বিশেষ দ্বায়িত্ব পৃথিবীর সব ধরনের গনহত্যা, গন অত্যাচারের প্রতি সংবেদনশীল থাকা।

প্রগতিশীল ইহুদীদের অনেকেই জাতীয়তাবাদী ইহুদীদের নিজস্ব এবং জাতীয় স্বার্থে হলোকস্টকে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে সোচ্চার। এই বিরোধীতা অবশ্যাম্ভীভাবেই তাদের জাতীয়তাবাদী ইহুদীদের বিশেষ আক্রমনের লক্ষ্যে পরিনত করে। যেহেতু ইহুদীদের ইহুদী-বিদ্বেষী বলা হাস্যকর শোনায় সেহেতু এদের জন্যে বাধা টাইটেল হলো self-hating jew। আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত self-hating jew সম্ভবত নোয়াম চমস্কি। তার খুব কাছেই আছেন নরম্যান ফিংকেলস্টাইন (http://en.wikipedia.org/wiki/Norman_G._Finkelstein)। ২০০১ সালে ফিংকেলস্টাইনের লেখা The Holocaust Industry (http://www.amazon.com/The-Holocaust-Industry-Reflections-Exploitation/dp/1859843239) বইটি, একটি বিশেষ গোষ্ঠী হলোকস্টকে কিভাবে নিজ স্বার্থ ও মতের পক্ষে নগ্নভাবে ব্যবহার করে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী লেখা। ফিংকেলস্টাইন তার লেখার জন্যে যে জাতীয়তাবাদী ইহুদীদের কাছ থেকে তীব্র হেনস্থা শিকার হয়েছিলেন এবং এখনো হচ্ছেন।

আব্রাহাম বার্গ ইজরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট এর স্পীকার ছিলেন এবং এক সময়ে আধুনিক ইহুদীদের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠান World Zionist Organization এর নেতা ছিলেন। বার্গ ২০০৭ সালে একটি বই লেখেন The Holocaust is Over; We Must Rise from Its Ashes (হলোকস্টের সমাপ্তি ঘটেছে; আমাদের উঠে দাড়াতে হবে মৃতের স্তুপ থেকে), যেখানে তিনি বলেন যে হলোকস্ট কে আলাদা ভাবে গন্য করার অবসান হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় আহত জাতির পক্ষে সর্বব্যাপি ভয়ংকর ঘটনার ছায়া থেকে বেড়িয়ে, উপর থেকে সবার পার্সপেক্টিভ থেকে ইতিহাসের মধ্যে ঘটনার অবস্থান দেখতে পারা সহজ হয় না। বার্গ বলেন যে হলোকস্ট ইহুদীদের জন্য বিশেষ অর্থবহ ঘটনা হলেও বিশ্বসমাজের বাকী সবার জন্যে কেবল বিংশ শতাব্দীর একের পর এক নৃশংশ গনহত্যার অন্যতম। সুতরাং হলোকস্টকে দেখতে হবে যে কোনো জাতির capacity to do absolute evil এর উদাহরন হিসেবেই। বার্গ তার বই এর জন্যে অনেক দিক থেকে তীব্র সমালোচনার লক্ষ্য হন এবং যথারীতি তার কপালে self-hating jew এর তকমা জোটে। (৩)

প্রগতিশীল ইহুদীদের চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া যাবে যেকোনো সাইন্স ফিকশন ভক্তের প্রিয় ব্যাক্তিত্ব আইজাক আসিমভ এর নিজের ভাষ্যে, (৬)

“ ১৯৭৭ সালে এক আলোচনা সেমিনারে আরও অন্যান্যদের সাথে আমি মঞ্চে ছিলাম এলি ভিজেল এর সাথে। এলি ভিজেল, যিনি হলোকস্ট সারভাইভ করেছেন এবং সারাক্ষন সেটা নিয়েই কথা বলেন। আমি এলি’র একটা বক্তব্যে খুবই বিরক্ত হলাম যখন এলি বললেন যে তিনি কখনো বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়ারদের পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন না কারন অনেক বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়ার হলোকস্ট পরিকল্পনা-পরিচালনায় অংশগ্রহন করেছিলো। কি অদ্ভুদ জেনারালাইজেশন! ঠিক এভাবেই হাজার বছর ধরে ইহুদী-বিদ্বেষীরা বলে এসেছে যে ‘আমি ইহুদীদের বিশ্বাস করতে পারি না কারন কোনো এক সময়ে কিছু ইহুদীই প্রভু যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে মেরেছে’।

আমি এলি’র কথাবার্তায় চুপ না থাকতে পেরে বলে উঠলাম, “ মিঃ ভিজেল, কোনো একটি গোষ্ঠী বা জাতি চরম বর্বরতার শিকার হয়েছে বলেই সেই গোষ্ঠীকে বিশেষ রকম নিস্পাপ, পুন্যবান বলা যাবে না। বর্বরতা-গনহত্যার শিকার হওয়া থেকে একটা কথাই ডেফিনিটলি বলা যাবে যে ঐ সময়টিতে গোষ্ঠীটি ছিলো অপেক্ষাকৃত দূর্বল, অত্যাচার ঠেকানোর শক্তি তাদের ছিলো না। পরিস্থিতি ভিন্ন হলে, দূর্বল গোষ্ঠীটি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হলে হয়তো তারাই অত্যাচারীর ভূমিকায় নিতো।“

ভিজেল উত্তেজিত হয়ে বললো, “একটা উদাহরন দেখাও দেখি যখন ইহুদীরা অন্যের উপরে অত্যাচার করেছিলো”। আমার কাছে উত্তর রেডীই ছিলো। “ খ্রীঃ পূঃ দ্বিতীয় শতকে প্যালেস্টাইনে ম্যাকাবিয়ান রাজত্বের সময়ে, জুডিয়া’র অধিপতি জন হাইরক্যানিউস, এডম দেশ জয় করে এবং এডমবাসীদের বলে দেয়, হয় সবাইকে ইহুদী ধর্ম গ্রহন করতে হবে নইলে সবাই তলোয়ারের নীচে পরবে। এডমবাসীরা বুদ্ধিমানের মতো ধর্মান্তর গ্রহন করলো। অবশ্য নতুন ইহুদীরা বেচে গেলেও সবার কাছে আদি ইহুদীদের চেয়ে নীচু শ্রেনীর ট্রিটমেন্ট পেতো কারন ইহুদী হলেও তারা এডমবাসী এটা কেউ ভুললো না।“

ভিজেল গলা চড়িয়ে উত্তর দিলো, “সেটাই ছিলো একমাত্র উদাহরন”।

আমি বললাম, “সেটাই ছিলো জানা ইতিহাসের একমাত্র সময় যখন ইহুদীরা অন্যদেশ জয় করতে পেরেছিলো। একের মধ্যে এক, খুব ভালো ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেয় না।“

এর পর আর কথা বাড়ে নি। ইচ্ছে করলে আমি আরো বলতে পারতাম বাইবেলে ডেভিড আর সলোমনের সময়ে কানানবাসীদের কি হাল হয়েছিলো সেটা বিস্তারিত বলতে। আমি যদি ভবিষৎদ্রষ্টা হতাম তবে হয়তো আগে থেকেই উল্লেখ করতে পারতাম আজকের দিনে ইজরায়েলে প্যালেস্টাইনীদের উপরে যা হচ্ছে তার কথা। আমেরিকান ইহুদীরা হয়তো পরিস্থিতি আরেকটু ভালোভাবে উপলদ্ধি করতে পারতো যদি প্যালেস্টাইনীরা ইজরায়েলে ক্ষমতায় থাকতো আর ইহুদী কিশোরেরা প্যালেস্টাইনী ট্যাংকের দিকে ঢিল ছুড়তো।

ঠিক এরকমই এক তর্ক একবার আমি করেছিলাম আব্রাহাম ডেভিডসন নামের এক ব্রিলিয়ান্ট সাইন্স ফিকশন লেখকের সাথে। আব্রাহাম সে সময়ে অর্থোডক্স (সনাতন) জুডাইজমের খুব ভক্ত ছিলো। আব্রাহামও এলি ভিজেল এর মতো আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো ইহুদীরা কবে কোন জাতির সাথে অসহিষহ্নু আচরন করেছে। আমি আব্রাহামকে বললাম, “তুমি আর আমি এমন এক দেশে থাকি যেখানে ৯৫% লোকই ইহুদী নয়। তবু আমরা খুব ভালো ভাবেই আছি এই দেশে। যদি চিত্রটা অন্যরকম হতো, আমরা যদি জেন্টাইল (অ-ইহুদী, সাধারনত ক্রিশ্চিয়ানদের বোঝায়) হতাম এবং ৯৫% অর্থোডক্স ইহুদীদের দেশে থাকতাম তবে আমরা কতটা ভালো থাকতাম বলে মনে হয় তোমার?” আব্রাহাম আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় নি।”

এতোক্ষন ধরে এইসব হলোকস্ট, ইহুদী, ইতিহাসে অনন্যতা এসব নিয়ে লেখা পুরোটাই আসলে মূল বক্তব্যের উপক্রমনিকা। এই কথাগুলি লেখার চিন্তা মাথায় এসেছিলো এক মাসেরও কিছু আগে, রোহিংগা রিফিউজী নিয়ে যখন কদিন মিডিয়া আর ব্লগজগতে বেশ আলোড়ন চলছিলো। তখন সময়ের অভাবে লেখা হয়নি।

রোহিংগা ইস্যুতে আমার ব্যক্তিগত প্রথম চিন্তা হলো রোহিংগা রিফিউজী নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অবস্থান বিতর্কিত হলেও পুরোপুরি অসমর্থনযোগ্য নয়। দারিদ্রতার অজুহাতে রিফিউজীদের ফিরিয়ে দেয়া কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না। কিন্তু প্র্যাক্টিকাল এবং ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিতে রোহিংগাদের দীর্ঘস্থায়ী আশ্রয় না দেবার যুক্তিকতা রয়েছে। এটা পরিষ্কার যে বার্মার সামরিক জান্তা সরকার এবং বার্মার বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশ, রোহিংগাদের নিয়ে একটা ‘ফাইনাল সলিউশন’ চায়। সুযোগ পেলে তারা দ্রুত ১০০% রোহিংগাদেরকেই বার্মা থেকে বিতাড়ন করবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে রোহিংগাদের দীর্ঘমেয়াদী আশ্রয় দিলে তা বার্মাতে রোহিংগাদের এথনিক ক্লিনসিংকেই উৎসাহিত করবে। বাংলাদেশ সরকার আর্ন্তজাতিক সমাজকে এই বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষন না করে বার বার কেনো যে নিজেদের অসামর্থ্যের অজুহাত তুলছে এটা আমার কাছে অপরিষ্কার। তবে এই ব্লগেই রোহিংগাদের আশ্রয় দেয়া-না দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, এ নিয়ে কথা বাড়ানোও এই লেখার উদ্দ্যেশ্য না।

রোহিংগা আশ্রয়প্রার্থীদের ছবি যখন মিডিয়াতে প্রকাশ পাওয়া শুরু হলো তখন অবশ্যাম্ভীভাবেই এই ছবিগুলো অনেককে মনে করিয়ে দিলো ৭১ এর বাংগালী রিফিউজিদের কথা। জাতির কাছে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী কালেক্টিভ ইমেজগুলির মধ্যে ভারতে আশ্রয়ের জন্যে ছুটে চলা হতবিহবল বৃদ্ধ-শিশু-নারী-পুরুষের সাদাকালো ছবিগুলি অন্যতম। আমাদের স্মৃতিতে ঐ অসাধারন ছবিগুলি স্থায়ীভাবে গেথে রয়েছে। এজন্যে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মিডিয়া-ব্লগে বলেছিলো যে জাতির কোটির বেশী রিফিউজি ৭১ এ চরম বিপদের সময়ে দরিদ্র ভারতে আশ্রয় পেয়েছিলো, সেই জাতির বর্বরতার শিকার, আশ্রয়হীন মানুষদের প্রতি আরো বেশী সংবেদনশীল হওয়া উচিৎ। কিন্তু দেখা গেলো এই তুলনা আসা মাত্রই প্রগতিশীল, মানবতাবাদীর ব্যাজ পরা অনেকে মৌচাকে ঢিল পরার মতো আলোড়িত হয়ে উঠেছে। অনেকে নানা পয়েন্টসহ লম্বা ফিরিস্তি দিলো কি কারনে এই তুলনার কথা মুখে আনাও ধৃষ্টতা তার সপক্ষে। কেউ আবার মানবতাবাদের মা বাবাকে গালাগালি করে বুঝিয়ে দিলো আমাদের মতো গরীব দেশের এই রাজনৈতিক ভাবে সেন্সিটিভ সময়ে মানবতার কথা ভাবা ক্ষতিকর বিলাসিতা।

বাংগালী জাতির জন্যে বিংশ শতাব্দী অত্যেন্ত traumatic একটি শতক। সবচেয়ে বড়ো মনুষ্য-সৃষ্ট দূর্ভিক্ষ, অন্যতম ভয়াবহ গনহত্যা, নীরব ও সরব এথনিক ক্লিনসিং, একের পর এক প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দূর্যোগ এরকম একের পর এক আঘাত এসেছে বাংগালীদের উপরে। কিন্তু এর কারনে বাংগালীরা বিশ্বের জাতিদের মধ্যে কোনো বিশেষ স্থান দাবি করতে পারে না। আমরা বলতে পারি না অন্য সবার জন্যে প্রযোজ্য মানদন্ড আমাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না। বরং এই মৃত্যুর মিছিল থেকে আমাদের সারা বিশ্বজুড়ে, সর্বসময়েই মানবিকতার লংঘন এবং আনুষ্ঠানিক নৃশংশতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে। আমাদের মানবতাবোধ, ন্যায়বিচার প্রত্যাশা ১৯৭১ এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলে আমরা লক্ষ প্রানের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন জাতির প্রকৃত আত্মিক উন্নতির পথ রুদ্ধ করবো।

৭১ এর অনন্যতা বিষয়ে আলোচনা অত্যেন্ত বিতর্কিত এবং এসম্পর্কে কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমি এই লেখার কলেবর আর বাড়াতে চাচ্ছি না। যদি কেঊ এনিয়ে আলোচনায় আগ্রহী হয় তবে কমেন্ট সেকশনে এ নিয়ে কথা বলা যাবে।
রেফারেন্সঃ
১। The dangers of calling the Holocaust unique By David E Stannard
http://www.codoh.com/library/document/530
২। Lecture 1: Is the Holocaust Unique?
http://www.jewishagency.org/JewishAgency/English/Jewish+Education/Compelling+Content/Jewish+Time/Festivals+and+Memorial+Days/Holocaust+Memorial+Day/Meanings/meanings1.htm
৩। Is the Holocaust Unique?
http://www.jewcy.com/arts-and-culture/holocaust_unique
৪। Debating the uniqueness of the Holocaust
http://www.codoh.com/library/document/529
৫। The Holocaust Obsession
http://democraticpeace.wordpress.com/2009/03/04/the-holocaust-obsession/
৬। THE HOLOCAUST AND GENOCIDE
http://www.bibliotecapleyades.net/sociopolitica/sociopol_holocaust09b.htm
৭। Rethinking the Holocaust By YEHUDA BAUER
http://www.nytimes.com/books/first/b/bauer-rethinking.html
৮। The Guiding Principles of Reform Judaism
http://ccarnet.org/rabbis-speak/platforms/guiding-principles-reform-judaism/